গাজার কষ্ট যে অনুভব করে না, সে মানুষই নয়
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে গাজা উপত্যকার মানবিক সংকট নিয়ে সরব হলেন মিসরের কোচ হোসাম হাসান। তিনি বলেন, গাজার কষ্ট যে অনুভব করে না সে মানুষ নয়।
ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ শেষ ষোলোর লড়াইয়ের আগে ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার চলমান অমানবিক সংকট নিয়ে এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন মিসরের প্রধান ফুটবল কোচ হোসাম হাসান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “পৃথিবীতে যদি কেউ ফিলিস্তিনিদের এই চরম কষ্ট ও নির্মমতা নিজের হৃদয়ে অনুভব করতে না পারে, তবে সে আসলে মানুষই নয়। সে আরব, ইউরোপীয় কিংবা আমেরিকান—যেই হোক না কেন, তার মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।”
বিশ্বকাপের ম্যাচপূর্ব অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে ফুটবলের কৌশল আলোচনার পাশাপাশি গাজার মানবিক বিপর্যয় নিয়ে কথা বলেন এই কিংবদন্তি আরব ফুটবলার ও কোচ।
ঐতিহাসিক জয় ফিলিস্তিনিদের উৎসর্গ ও মাঠে পতাকা ওড়ানো:
এর আগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় পাওয়ার পর পরই সেই অবিস্মরণীয় সাফল্যকে ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন হোসাম হাসান। এমনকি ম্যাচ জয়ের পর মাঠের ভেতরে ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা ওড়াতেও দেখা যায় তাঁকে।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে মাঠের সেই রাজনৈতিক ও মানবিক সংহতি প্রদর্শন নিয়ে বিশ্বগণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত বিষয় ছিল না, এটি ছিল শুধুই একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমার অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মানবিক প্রতিক্রিয়া।”
নিরীহ মানুষের মৃত্যু যেন এখন ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা:
বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করে মিসরীয় কোচ বলেন, “আজকের বিশ্বে যদি কোনো প্রান্তে একটি অবলা প্রাণীর ওপর সামান্যতম নির্যাতন হয়, তবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তীব্র প্রতিবাদ জানায়। অথচ প্রতিদিন হাজার হাজার নিরীহ ও নিষ্পাপ মানুষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নির্মমভাবে নিহত হওয়ার খবর যেন এখন বিশ্ববাসীর কাছে খুব স্বাভাবিক একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছে।” তিনি মনে করেন, কোনো ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের দেয়াল তোলার আগে, স্রেফ একজন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই এই চরম নির্যাতিত ও মজলুম ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
হোসাম হাসান আরও যোগ করেন, “আমি একজন আরব হওয়ার আগে মূলত একজন মানুষ। ফুটবল মাঠের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে আমার মূল বার্তা হলো—ফিফা (FIFA) যেমন সবসময় বর্ণবাদ বিরোধী স্লোগান দিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধার কথা বলে, তেমনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ এই সংস্থাসহ সবারই মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার অধিকারকেও সম্মান জানানো উচিত।”
আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে নিয়ে পরিকল্পনা:
গাজা ইস্যুর পর নকআউট পর্বের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা ও বিশ্বসেরা তারকা লিওনেল মেসিকে নিয়েও কথা বলেন হোসাম হাসান। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই প্রসঙ্গে তিনি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, “ফুটবল মাঠে আমাদের স্বপ্নের কোনো সীমা নেই। মাঠের লড়াইয়ে আমরা নিজেদের কখনোই ছোট বা দুর্বল দল মনে করি না। কোটি সমর্থকদের প্রত্যাশা ও ভালোবাসা পূরণে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ কৌশল দিয়ে চেষ্টা করব।”
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় বর্বর ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলায় অন্তত ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের সিংহভাগই নিরীহ নারী ও শিশু। এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংকটে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ফিলিস্তিনের এই চরম দুঃসময়ে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াঙ্গনের অনেক তারকা ক্রীড়াবিদই খেলাধুলার পাশাপাশি প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি নিজেদের দৃঢ় সংহতি ও সমর্থন জানিয়ে আসছেন।


