কওমি সিলেবাসের সংস্কার জরুরি তবে অতি আধুনিকায়ন নয়: আ ফ ম খালিদ হোসেন
কওমি মাদরাসার মৌলিকত্ব ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ বিষয়াবলি যুক্ত করে সিলেবাস সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।
কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা ও মূল ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে যুগোপযোগী সিলেবাস সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তবে আলিয়া মাদরাসার মতো ব্যাপক বা ‘অতি আধুনিকায়ন’ কওমি শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি কওমি মাদরাসার শিক্ষাপদ্ধতি, ফারসি ভাষার প্রাসঙ্গিকতা এবং জেনারেল শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।
'মৌলিকত্ব ঠিক রেখে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিজ্ঞান-গণিত জরুরি'
সাক্ষাৎকারে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, “কওমি মাদরাসা একটি বিশেষায়িত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি ডাক্তার বা প্রকৌশলী বানানোর জায়গা নয়, বরং খাঁটি আলেম তৈরির কারখানা। তবে বর্তমান যুগের প্রয়োজনীয়তা বিচারে কওমি মাদরাসার মৌলিকত্ব ঠিক রেখে নিচের দিকে অন্তত অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), গণিত ও ইংরেজির মতো আধুনিক বিষয়গুলো সমন্বিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য কওমি থেকে আলেম তৈরি করা। তবে কেউ যদি পরবর্তীতে ডাক্তারি বা প্রকৌশল বিদ্যায় পড়তে চায়, সেই দরজাও যেন তার জন্য খোলা থাকে—সিলেবাসটা এমনভাবে পুনর্গঠন করা উচিত।”
দেওবন্দের ঐতিহাসিক সংস্কারের উদাহরণ
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “যুগ ও কালের চাহিদানুযায়ী দারুল উলূম দেওবন্দের সিলেবাসও বারবার পরিমার্জিত হয়েছে। ভারতবর্ষের প্রাচীন ‘নেজামে তালিমে’ হাদিসশাস্ত্রের এমন ব্যাপকতা ছিল না। মহাত্মা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) প্রথম 'সিয়াহ সিত্তাহ' (বিখ্যাত ৬টি সহিহ হাদিসের কিতাব) সিলেবাসে যুক্ত করে শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। ১৮৬৬ সালে আল্লামা কাসেম নানুতবি ও হাজী আবেদ হুসাইন (রহ.)-এর হাত ধরে দেওবন্দে যে ধারার সূচনা, তা আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তবে এই সংস্কারের ভার কওমি মাদরাসার অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরামকেই নিতে হবে, বাইরের কারো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয়।”
'আলিয়া মাদরাসার মতো অতি আধুনিকায়ন ক্ষতিকর'
আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আলিয়া মাদরাসার সিলেবাসে এতো বেশি পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে যে, তা সাধারণ বা জেনারেল শিক্ষার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ফলে মাদরাসা শিক্ষার আসল ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কওমি মাদরাসায় তেমন অতি আধুনিকায়ন করলে হিতে বিপরীত হবে।”
ফারসি বাদ দিয়ে আরবি ভাষায় জোর দেওয়ার আহ্বান
কওমি মাদরাসার প্রচলিত সিলেবাসে ফারসি ভাষা পাঠদান নিয়ে আপত্তি তুলে তিনি বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ফারসি ভাষা শেখার তেমন বাস্তবিক প্রয়োজন নেই; এতে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ফারসির বদলে আরবি ভাষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ তাফসির, হাদিস ও ফিকহের মূল কিতাবসমূহ আরবিতে রচিত এবং আরবিই মুসলিম বিশ্বের প্রধান যোগাযোগের ভাষা।”


