পটিয়া প্রেস ক্লাবে ঢুকে সাংবাদিকের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ
চট্টগ্রামের পটিয়া প্রেস ক্লাবে ঢুকে সাংবাদিক আবেদুজ্জামান আমিরীকে টেনেহিঁচড়ে বের করে প্রকাশ্যে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতা রেজা রিপনের বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রামের পটিয়া প্রেস ক্লাবে ঢুকে অন্য সাংবাদিকদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের ওপর প্রকাশ্যে বর্বরোচিত হামলা ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার তীব্র অভিযোগ উঠেছে। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পটিয়া প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে।
হামলায় দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক যুগান্তর ও স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলা টিভির পটিয়া প্রতিনিধি আবেদুজ্জামান আমিরী গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে পটিয়া সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনি বাদী হয়ে পটিয়া থানায় একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
প্রেস ক্লাব থেকে সাংবাদিকদের বের করে দিয়ে তাণ্ডব:
প্রেস ক্লাবে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিক সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে পটিয়া উপজেলা যুবদলের বিতর্কিত নেতা এস এম রেজা রিপনের নেতৃত্বে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি বহিরাগত ও সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী হঠাৎ পটিয়া প্রেস ক্লাবে প্রবেশ করে। ক্লাবে ঢুকেই তারা সেখানে অবস্থানরত অন্য সাধারণ গণমাধ্যমকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক কক্ষ থেকে বের করে দেয়। একপর্যায়ে তারা যুগান্তর প্রতিনিধি আবেদ আমিরীকে কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে ক্লাব ভবনের বাইরে নিয়ে আসে এবং কিল-ঘুষি ও লাথি মেরে প্রকাশ্যে হত্যার চেষ্টা চালায়।
আহত সাংবাদিক আবেদুজ্জামান আমিরী ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে বলেন:
“আমরা প্রতিদিনের মতো পটিয়া প্রেস ক্লাবে বসে পেশাগত কাজ করছিলাম। হঠাৎ যুবদল নেতা এস এম রেজা রিপনের নেতৃত্বে একদল ক্যাডার বাহিনী গালিগালাজ করতে করতে ক্লাবে ঢোকে। তারা অন্য সাংবাদিকদের জোর করে তাড়িয়ে দেয় এবং আমাকে কলার চেপে টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে মাটিতে ফেলে দেয়। তারা আমাকে লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে এবং শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার চেষ্টা চালায়। সহকর্মী ও স্থানীয়রা এগিয়ে এলে তারা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায়।”
নেপথ্যে ১৩৩ কোটি টাকার বাঁধের বালু লুটের খবর:
হামলার মূল কারণ সম্পর্কে সাংবাদিক আবেদ আমিরী জানান, যুবদল নেতা এস এম রেজা রিপনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পটিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘শ্রীমাই খাল’ থেকে দিনরাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও লুটপাট করা হচ্ছিল। যার ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত ১৩৩ কোটি টাকার একটি নদী রক্ষা বাঁধ চরম ধসের ঝুঁকিতে পড়ে। এই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট জনদুর্ভোগ নিয়ে গত ৬ মার্চ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘শ্রীমাই খালে দুই যুবদল নেতার ধ্বংসযজ্ঞ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী ও সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়।
উক্ত সংবাদ প্রকাশের পর পটিয়া আসনের সংসদ সদস্যের (এমপি) কঠোর নির্দেশে প্রশাসন শ্রীমাই খালের বালু লুটপাট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এতে যুবদল নেতা রিপন বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে সাংবাদিক আবেদ আমিরীর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। আমিরী আরও জানান, “রিপন আমাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণনাশের পরিকল্পনা আসছিল। বিষয়টি আমি পটিয়ার স্থানীয় এমপি ও পটিয়া থানার ওসি মহোদয়কে আগেই লিখিত ও মৌখিকভাবে অবগত করে জিডি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যেই আজ এই কাপুরুষোচিত হামলা হলো।”
অভিযোগ অস্বীকার রিপনের, ফুঁসে উঠেছেন সাংবাদিকরা:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত যুবদল নেতা এস এম রেজা রিপনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুকৌশলে দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি এই হামলার বিষয়ে কিছুই জানি না। প্রেস ক্লাবে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।”
এদিকে প্রেস ক্লাবের ভেতরে ঢুকে প্রকাশ্য দিবালোকে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলায় পটিয়ার সাংবাদিক সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। পটিয়া প্রেস ক্লাবের শীর্ষ নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের ওপর এই হামলা মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি ফ্যাসিবাদের মতো বড় আঘাত। হামলাকারী যুবদল নেতা ও তার ক্যাডারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের সাংবাদিকদের নিয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”
পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বিকেলে জানান, “সাংবাদিক আবেদুজ্জামান আমিরীর ওপর হামলার ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। প্রেস ক্লাবের মতো জায়গায় এমন হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”


