যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি বরখাস্ত
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে যৌন নিপীড়নের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে (৫৫) তাঁরই নিজ দপ্তরের এক নারী সহকর্মীকে গুরুতর যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তা করার অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আদালতের একটি উচ্চপর্যায়ের এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকারী সংস্থা গতকাল সোমবার (৮ জুন) এই ব্রিটিশ আইনজীবীকে বহিষ্কারের আদেশ জারি করে।
আইসিসির রোম সংবিধির আওতাভুক্ত সদস্য দেশগুলোর সর্বোচ্চ পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিস’ (ASP)-এর ২১ সদস্যের বিশেষ ‘ব্যুরো’ এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই বরখাস্তের সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য এএসপির মূল কাউন্সিলে পাঠানো হয়েছে, যেখানে আইসিসির সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যুক্ত আছেন।
পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বরখাস্ত:
এএসপির ব্যুরো পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক অফিশিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “পরিষদের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের (Majority Vote) ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত রায় বা সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে অবিলম্বে তাঁর দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (Suspended) রাখা হবে।”
তবে আইসিসির পরিচালনাকারী সংস্থাটি বিবৃতিতে এটিও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে যে, এই সাময়িক বরখাস্তের আদেশ কোনোভাবেই করিম খানের বিরুদ্ধে চলমান মূল মামলার চূড়ান্ত ফলাফলের কোনো আগাম আইনি ইঙ্গিত বহন করে না। এটি কেবল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে নেওয়া একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
ভলান্টারি ছুটি ও আলোচিত মামলা থেকে প্রত্যাহার:
ব্যুরোর নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, প্রধান কৌঁসুলিকে বরখাস্তের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে আদালতের দৈনন্দিন বিচারিক কার্যক্রমে তেমন কোনো বড় ধরনের স্থবিরতা বা প্রভাব পড়বে না। কারণ, ৫৫ বছর বয়সী এই আলোচিত ব্রিটিশ আইনজীবী নিজের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ স্বাধীনভাবে মোকাবেলা করার জন্য এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসেই স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে ছুটিতে গিয়েছিলেন। অবশ্য শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছেন করিম খান।
সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ফিলিপাইনের সাবেক বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিরুদ্ধে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালতের পক্ষে মূল যুক্তি উপস্থাপনের (Arguments) প্রধান দায়িত্ব থেকেও করিম খানকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এটি বর্তমানে আইসিসির ডকে থাকা অন্যতম সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল ও আলোচিত মামলা। এএসপির বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, করিম খানের এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পরবর্তী আইনি করণীয় ঠিক করতে যত দ্রুত সম্ভব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরিষদের একটি ‘বিশেষ জরুরি অধিবেশন’ আহ্বান করা হবে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে আলোচনায় আসেন যিনি:
পেশায় তুখোড় ব্রিটিশ আইনজীবী করিম খান মূলত বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনার কেন্দ্রে আসেন ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে। তিনি আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির জন্য সফলভাবে আইনি আবেদন করেছিলেন।
যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আইসিসি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এছাড়াও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলা ও তদন্তের স্বার্থে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজীবী। এবার তাঁরই বিরুদ্ধে আনা হলো দাপ্তরিক যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ।


