মসজিদ-মন্দির ঘিরে জয়পুরে উত্তেজনা, ৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন
ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে সড়ক প্রশস্তকরণে নূরানী মসজিদ ও মন্দিরসহ ৫টি ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ ঘিরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার জেরে ৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন ও ১৪৪ ধারা জারি।
ভারতের রাজস্থান রাজ্যের রাজধানী জয়পুরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্ত করার কাজকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের সীমানায় থাকা একটি প্রাচীন মসজিদ, মাজার ও দুটি মন্দিরসহ মোট পাঁচটি ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের তালিকায় থাকায় সেখানে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রুখতে পুরো এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রায় ৩ হাজার সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ, ২২ জুন পর্যন্ত ১৪৪ ধারা:
জয়পুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (জেডিএ) ও জেলা প্রশাসনের যৌথ এই উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের গুজব বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা না ছড়ায়, সে জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে রাজস্থান পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জয়পুর উত্তর ও জয়পুর পূর্ব পুলিশ জেলার মোট ৩৪টি থানার আওতাধীন এলাকায় পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট, বাল্ক এসএমএস এবং সমস্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ) সেবা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ, জমায়েত ও মিছিল নিষিদ্ধ করে আগামী ২২ জুন পর্যন্ত পুরো এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
অভিযানটি চলছে জগতপুরা এলাকার নন্দপুরী আন্ডারপাসের কাছে। বর্তমানে রেললাইনের সমান্তরালে থাকা প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি মাত্র ২৫ থেকে ৩০ ফুট চওড়া। সরকারি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এটিকে ৮০ ফুটে উন্নীত করার কাজ চলছে। অভিযানস্থলের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজস্থান আর্মড কনস্ট্যাবুলারির (আরএসি) ১২টি কোম্পানিসহ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পুরো নন্দপুরী এলাকাকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দিয়ে ড্রোন ক্যামেরার সাহায্যে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
উচ্ছেদের তালিকায় নূরানী মসজিদ ও মাজার, ক্ষুব্ধ মুসলিম সমাজ:
এবারের উচ্ছেদ অভিযানে রাস্তার সীমানার মধ্যে থাকা মোট পাঁচটি ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি মসজিদ, একটি মাজার বা দরগাহ, দুটি মন্দির এবং একটি সৎসঙ্গ হল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজ উদ্যোগে স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর আজ সরাসরি বুলডোজার নিয়ে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক ‘নূরানী মসজিদ’ উচ্ছেদকে ঘিরে। গত রোববার রাতে মোতি দুঙ্গরি রোডের মুসাফিরখানায় মসজিদ কমিটি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে একটি দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন এবং এই উচ্ছেদের তীব্র বিরোধিতা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে স্থানীয় কংগ্রেস বিধায়ক আমিন কাগজিকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, “আমরা মুসলিমরা নিজেদের হাতে ঘর বা মসজিদ ভাঙার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারি না। আমরা প্রশাসনের কাছে শুধু অনুরোধ করেছিলাম, সড়কের সুবিধার্থে মসজিদের আকার ৪০ ফুট থেকে কমিয়ে ২০ ফুট করা হোক, যাতে ভেতরে অন্তত নামাজ পড়ার ন্যূনতম জায়গা থাকে। কিন্তু উগ্র প্রশাসন আমাদের সেই যুক্তিসঙ্গত আরজিতে রাজি হয়নি।”
একই সভায় উপস্থিত আরেক কংগ্রেস বিধায়ক রফিক খান ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মাজারটি দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের এবং নূরানী মসজিদটি ১৯৮১ সালে মুসলমানদের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা জমিতে নির্মিত হয়েছিল। এমনকি ১৯৯৪ সালে মসজিদের উন্নয়ন ফি-ও জয়পুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (জেডিএ) তহবিলে জমা দেওয়া হয়। অথচ ২০০০ সালের পর যথাযথ ভেরিফিকেশন ছাড়াই মাস্টারপ্ল্যানে রাস্তাটিকে হঠাৎ ৮০ ফুট চওড়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে পুরো এলাকায় একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তবে মুসলিম সম্প্রদায় এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পথে লড়াই চালিয়ে যাবে।
কেন এই রাস্তাটি এত গুরুত্বপূর্ণ:
অপরদিকে প্রশাসনের দাবি, এই সড়কটি সরকারি নথিতেই ৮০ ফুট চওড়া হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। এই প্রধান রাস্তাটি মালব্য নগর ও নন্দপুরী কলোনিকে জগতপুরা এবং প্রতাপ নগরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। পাশাপাশি এটি জগতপুরা রেলওয়ে স্টেশন ও জয়পুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পথ।
দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কারণে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে সার্বক্ষণিক তীব্র যানজট সৃষ্টি হতো, যার ফলে প্রায় ৫০টি কলোনির বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে যেতে হতো। প্রশাসনের দাবি, উচ্ছেদ শেষে সড়কটি ৮০ ফুট চওড়া হলে জয়পুরের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনে যাতায়াতের জন্য একটি সহজ বিকল্প পথ উন্মুক্ত হবে।


