শিক্ষার্থীদের জন্য পঁচা খাবার সরবরাহ, দুই কর্মকর্তা কারাগারে

মাদারীপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে সরকারি পুষ্টি প্রকল্পের পচা ও বিষাক্ত খাবার সরবরাহের মামলায় সমতা ট্রেডার্সের দুই অপারেশন কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

Jun 10, 2026 - 12:17
 0  3
শিক্ষার্থীদের জন্য পঁচা খাবার সরবরাহ, দুই কর্মকর্তা কারাগারে
×

মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে সরকারি পুষ্টি প্রকল্পের পচা, বাসি ও বিষাক্ত খাবার সরবরাহ করার গুরুতর ফৌজদারি মামলায় একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষ অপারেশন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

​গত মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে মাদারীপুর জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. এলিয়াম হোসেন আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এই আদেশ দেন। এর আগে সোমবার গভীর রাতে জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র চাঁনমারি এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে মাদারীপুর সদর মডেল থানা পুলিশ তাদের হাতেনাতে গ্রেফতার করে।

​গ্রেফতারকৃতরা হলেন— ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের মৃত গিয়াসউদ্দিনের ছেলে আহসানুল হাবিব (৫২) এবং বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার পার্বতী শিবপুর এলাকার নুরুল ইসলাম খানের ছেলে নুরুজ্জামান খান (৪৪)। তারা দুজনেই অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সমতা ট্রেডার্স’-এর অপারেশনাল ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

টিফিন খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল শত শত শিশু:

​মামলার এজাহার ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ‘স্কুল ফিডিং কার্যক্রম’-এর আওতায় নিয়মিত পুষ্টিকর রুটি, কলা ও ডিম টিফিন হিসেবে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আসছে সরকার। ‘সমতা ট্রেডার্স’ নামের একটি লাইসেন্সধারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই খাবারগুলো প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি ছিল।

​গত ৮ এপ্রিল দুপুরে মাদারীপুর সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সমতা ট্রেডার্সের দেওয়া ওই টিফিন খাওয়ার পরপরই গণহারে পেটে ব্যথা ও বমির উদ্রেক নিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে মারাত্মকভাবে ফুড পয়জনিং (খাদ্য বিষক্রিয়া) হওয়া বেশ কয়েকজন শিশুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

​এই পৈশাচিক ও অমানবিক ঘটনাটি দ্রুত জানাজানি হলে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবার রিপন তাৎক্ষণিকভাবে ওই বিদ্যালয়গুলোতে ছুটে যান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহকৃত অত্যন্ত নিম্নমানের ও পচা রুটি, কলা ও ডিম আলামত হিসেবে জব্দ করেন। ঘটনার পরের দিনই মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজ মর্জিনা আক্তার এক অফিসিয়াল আদেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জুয়েল আহম্মেদকে প্রধান করে উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির নিবিড় অনুসন্ধানে পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সরবরাহের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি ও অপরাধের সত্যতা প্রমাণিত হয়।

​মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ ও প্রধান শিক্ষকের মামলা:

জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে এই স্পর্শকাতর সংবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার হলে সরকারের উচ্চমহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় প্রকল্প পরিচালক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হারুন অর রশীদ সশরীরে মাদারীপুরের দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করেন যে— শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তেও এই নষ্ট খাবার সরবরাহের সুনির্দিষ্ট সত্যতা মেলে।

​পরবর্তীতে গত ২৭ এপ্রিল সদর উপজেলার ১৬৫ নম্বর পোকরার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহেরুন চৌধুরী বাদী হয়ে শিশুদের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগে সমতা ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে বেগমগঞ্জ তথা মাদারীপুর সদর মডেল থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।

​মাদারীপুর সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম আজাদ এই চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতির বিষয়ে আজ নিশ্চিত করে জানান, “কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা ও বিষাক্ত খাবার সরবরাহ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার মামলায় আমরা সমতা ট্রেডার্সের দুই মূল অপারেশন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করেছিলাম। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই জঘন্য অপরাধের পেছনের মূল মালিকপক্ষ ও সিন্ডিকেটের বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”