নাটোরে রাতের আঁধারে কৃষকের ৯০০ পেঁপে গাছ সাবাড়
নাটোরের লালপুরে পদ্মাচরের নওসারা সুলতানপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে রাতের আঁধারে দুই ভাইয়ের স্বপ্ন জড়ানো ৯০০ পেঁপে গাছ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। নিঃস্ব কৃষক পরিবার।
মানুষের সঙ্গে মানুষের কোন্দল বা জমিজমা নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু এই অবলা গাছের সঙ্গে দুর্বৃত্তদের কী শত্রুতা? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি!”— নাটোরের লালপুরে রাতের আঁধারে এক অসহায় কৃষকের স্বপ্ন জড়ানো প্রায় ৯০০টি ফলন্ত পেঁপে গাছ কেটে সাবাড় করার পর এমনভাবেই ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করছিলেন স্থানীয় কৃষকেরা। এই বর্বরোচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভুক্তভোগী কৃষকের প্রায় ৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) দিবাগত রাতের কোনো এক সময় উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের দুর্গম পদ্মাচরের নওসারা সুলতানপুর এলাকায় এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা হলেন— ওই এলাকার মো. নাজিম উদ্দীনের দুই ছেলে মো. সুজন আলী ও মো. নাজমুল আলী।
মাঠজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে স্বপ্ন ও ফলন্ত গাছ:
আজ বুধবার (১০ জুন) সকালে সরেজমিনে নওসারা সুলতানপুর এলাকার ওই পেঁপে বাগানে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দিগন্তজোড়া বাগানের প্রায় ৯০০টি তরতাজা পেঁপে গাছ গোড়া থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলসহ কেটে ফেলা গাছগুলো পুরো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মরে পড়ে আছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও অন্য চাষিরা জানান, দুই ভাই দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চরের বুকে এই পেঁপে বাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই এই বিশাল পরিমাণের পেঁপেগুলো বাজারে তোলার এবং বিক্রি করার সম্পূর্ণ উপযোগী হয়ে উঠতো। কিন্তু বাজারে বিক্রির ঠিক আগমুহূর্তে দুর্বৃত্তদের এমন নির্মম কাণ্ডে দুই প্রান্তিক কৃষকের সমস্ত স্বপ্ন ও পরিশ্রম এক রাতের ব্যবধানে চুরমার হয়ে গেছে।
ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা কৃষক পরিবার:
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বড় ভাই রায়হান আলী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন:
“আমার ছোট দুই ভাই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চড়া সুদে কৃষি ঋণ নিয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে অনেক টাকা ধারদেনা করে অন্যের জমি বর্গা (লিজ) নিয়ে এই পেঁপে বাগানটি গড়ে তুলেছিল। বাগানটির পেছনেই আমাদের পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে ছিল। কিন্তু শত্রুরা রাতের আঁধারে কাপুরুষের মতো সব গাছ কেটে দিয়ে আমাদের বেঁচে থাকার ও আয়ের একমাত্র প্রধান উৎসটি চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ হবে, তা ভেবে আমরা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব ও দিশেহারা হয়ে পড়েছি।”
এদিকে ফসলের ওপর এমন বর্বরোচিত ও অমানবিক নির্মমতার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। চরের অন্য চাষিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়ে অবিলম্বে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো জঘন্য চক্র কৃষকের ফসলে হাত দেওয়ার সাহস না পায়।
লালপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম আজ দুপুরে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশের একটি বিশেষ তদন্ত দল আজ সকালে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। চরের জমিসংক্রান্ত কোনো পূর্ব শত্রুতার জেরে এই ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের চিহ্নিত করে খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


