মাদরাসায় যৌন নির্যাতন রোধে তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব শায়েখ আহমাদুল্লাহর, দিলেন ৭ দফা সুপারিশ
আবাসিক মাদরাসায় যৌন নিপীড়ন ও অনাচার বন্ধে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠনের জোরালো প্রস্তাব দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়েখ আহমাদুল্লাহ।
দেশের মাদরাসাভিত্তিক আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও অনৈতিক অনাচারের যেকোনো অভিযোগ বন্ধে কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশের জনপ্রিয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়েখ আহমাদুল্লাহ। একইসঙ্গে এ ধরনের স্পর্শকাতর অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে আলেমদের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র 'তদন্ত কমিশন' গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
পবিত্র হজের উদ্দেশ্যে বর্তমানে সৌদি আরব সফরে থাকা এই জনপ্রিয় আলেম আজ রোববার (২৪ মে) সকালে তাঁর অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক) হ্যান্ডেলে দেওয়া এক দীর্ঘ ও নীতিগত পোস্টে এই প্রস্তাবনা ও নিজের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
বাস্তবতা অস্বীকারের সুযোগ নেই:
পোস্টে শায়েখ আহমাদুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আবাসিক মাদরাসাগুলোতে মাঝেমধ্যে ঘটে যাওয়া কিছু যৌন অনাচারের অপ্রিয় ঘটনাকে ঢেকে রাখা বা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই ব্যাধি থেকে সমাজ ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত করতে আমি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিভিন্ন পরামর্শ ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ দিয়ে আসছি।" তিনি জানান, বর্তমানে পবিত্র হজ সফরে দেশের বাইরে থাকলেও, বাংলাদেশে ফিরেই এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারক আলেমদের সাথে বসে বিস্তারিত লিখিত প্রস্তাবনা উপস্থাপন এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে।
যৌন অনাচার রোধে শায়েখ আহমাদুল্লাহর ৭ দফা সুপারিশ:
আবাসিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের ১০০ ভাগ নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনি কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন:
১. সিসিটিভি ও নজরদারি: মাদরাসার প্রতিটি আবাসিক কক্ষ, বারান্দা ও শ্রেণিকক্ষ সার্বক্ষণিক সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
২. শিক্ষক প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের পেশাগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও আইনি বিষয়গুলো বুঝতে পারেন।
৩. শিক্ষকদের আবাসন: আবাসিক শিক্ষকদের জন্য মাদরাসা ক্যাম্পাস বা তার কাছাকাছি ফ্যামিলি বাসা (পারিবারিক আবাসন) নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. আলাদা কক্ষ ও খাট: শিক্ষার্থীদের আবাসন ও শ্রেণিকক্ষ সম্পূর্ণ পৃথক রাখতে হবে এবং বড় কক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে পৃথক একক খাটের (Single Bed) ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. মহিলা মাদরাসায় পুরুষ নিষিদ্ধ: বালিকা বা মহিলা মাদরাসাগুলোতে কোনোভাবেই পুরুষ শিক্ষক বা পুরুষ স্টাফ নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
৬. ছোট মাদরাসায় কঠোর নজরদারি: দেশের বড় ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় অনিয়ন্ত্রিত ও যত্রতত্র গড়ে ওঠা ছোট ছোট আবাসিক মাদরাসাগুলোতেই এই ধরনের অপ্রীতিকর অভিযোগ বেশি শোনা যায়; তাই এগুলোর ওপর তদারকি বাড়াতে হবে।
৭. নিরপরাধদের সুরক্ষা: কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধের ঘটনা যেমন সত্য, তেমনি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রোশে নিরপরাধ আলেম বা ইমামদের বিরুদ্ধেও মিথ্যা অপবাদ ছড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফেনীর একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ফরেনসিক ও মেডিকেল পরীক্ষায় স্থানীয় ইমামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা মেলেনি। তাই প্রকৃত অপরাধী ও ষড়যন্ত্রকারী— উভয়কেই চিহ্নিত করা দরকার।
হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠনের প্রস্তাব:
এই সংকটের একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান কল্পে শায়েখ আহমাদুল্লাহ দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ অথরিটি ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীনে শীর্ষস্থানীয় আলেম ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন।
তিনি সুপারিশ করেন, দেশের কোথাও কোনো মাদরাসায় এ ধরনের অনৈতিক অভিযোগ ওঠামাত্রই এই ওলামা কমিশন স্বউদ্যোগে ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে, অভিযুক্ত অপরাধীকে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে তিনি যেন দেশের আর কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা শিক্ষকতা করতে না পারেন, সেই স্থায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি ও জনআস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে আলেম সমাজকেই এখন সবার আগে কার্যকর ও সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।


