বিদ্যুতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, দেউলিয়া পরিস্থিতি বলছেন নতুন মন্ত্রী
৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে ‘দেউলিয়া’ পরিস্থিতির মুখে নতুন সরকার। গ্রীষ্মের লোডশেডিং এড়াতে ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’-এর পরিকল্পনা করছেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
দেশি বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের দেনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের নতুন সরকার বিদ্যুৎ খাতে একটা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে যাচ্ছে। রমজানের পরপরই সেচ ও গ্রীস্ম মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে পরিকল্পনা থাকলেও সমাধান করতে বেগ পেতে হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এখনই বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এ বছর বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা আঠারো হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে ধারণা দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সরকারের নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলছেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্যাস কয়লা ও তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালিয়ে চাহিদা পূরণ করতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, অর্থ সংস্থান করে পরিস্থিতি সামাল দিতে তার ভাষায় 'ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট' করতে হবে। তিনি বলেন, "পরিকল্পনা আছে তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুতে টোট্যালি ফিনান্সিয়ালি ব্যাংকরাপ্ট করে দিছে আরকি। অনেক বকেয়া, অনেক দেনা পাওনা। জ্বালানি নাই জ্বালানি ইমপোর্ট করতে হবে। মোট কথা হলো ভেরি কমপ্লিকেটেড। কাজ করে এগুলি সমাধান করতে হবে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি তাতে সংকট কাটাতে সরকারের সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ জ্বালানি আমদানি সরাসরি ডলারের মজুদে প্রভাব ফেলবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বিশ্লেষণ হলো, নরমালি আমরা যেটা দেখি গরম যখন পড়বে তখন দেখা যাবে যে প্রচুর লোডশেডিং হবে।
বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আমদানি সক্ষমতা মিলিয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। সারাদেশে বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লক্ষ। দেশে একদিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২৩ জুলাই ২০২৫ সালে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।
বিপুল পরিমাণ দেনা
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি বিদেশি কোম্পানির কাছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিসেবে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে তাদের। বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত সাত-আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পায়নি।
এত বকেয়া কীভাবে জমলো এ প্রশ্নে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এটা বেড়েছে। তিনি বলেছেন, "এটা ফ্রম দা বিগিনিং কিউমিলিটিভ হারে হতে হতে এ অবস্থায় এসেছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সরকারের থেকে সাবসিডি সেটা মাইনাস হচ্ছে এভাবে হতে হতে এ পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে আরো কিছু মাইনাস হবে আমরা সরকার থেকে আরো কিছু টাকা পাবো সাবসিডি।"
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলেও জানায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে কিনা সে সন্দেহের কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে সাবেক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, টাকার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের উপর নির্ভর করে, এখানে ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। সাবেক বিদ্যুৎ জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, সরকারের শেষ পর্যায়ে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করার একটা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, "অর্থ পরিশোধ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সক্ষমতা উপর নির্ভর করে। রেভিনিউ সংকটের কারণেই তারা বিল পরিশোধ করতে পারেনি। কোনো ইনটেনশনাল কিছু নেই। এটা টাকার অ্যাভেলএবিলিটির উপর নির্ভর করে। বিপিডিবি যখন টাকা পায় তখন দেয়। ওদের সোর্স হচ্ছে রেভিনিউ এবং অর্থবিভাগ থেকে ভর্তুকী।"
বাংলাদেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মোট উৎপাদন সক্ষমতার ২৩ শতাংশের মত। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলে চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৫৬৩৭ মেগাওয়াট বা ২০ শতাংশের মতো। এর মধ্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সক্ষমতাই প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট।
লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা
সরকার শিগগিরই বকেয়া পরিশোধ শুরু না করলে গরমে চাহিদামত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন হবে বলে উল্লেখ করেছে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিপপা। তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বলছে, বিলের বকেয়া কমিয়ে চার পাঁচ মাসে না আনলে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে। বিপপার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলসি খুলতে সমস্যার কারণে এরই মধ্যে তেলের নিট মজুদ কমেছে। গত জানুয়ারিতে যে মজুদ এক লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি ছিল, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসে নিট মজুদ আশি হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি সংকট ও সমাধান
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখন থেকে এক মাস পরে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমরা যদি মনে করি তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করবো, এলএনজি ইমপোর্ট করবো এবং কয়লা আমদানি করবো, কিন্তু প্রশ্ন হলো এটার জন্য যতটুক খরচা হবে, যতটা ডলার লাগবে সেটা কি দেয়া হবে কিনা। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মত লাগে। কিন্তু আমাদের এত টাকা নাই।"
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করবে সরকার। তিনি বলেন, "এখন প্রায়োরিটি রোজার মধ্যে বিদ্যুৎ চালানো, সেচের সময় বিদ্যুৎ চালানো মানুষের কষ্ট যাতে কম হয় সেটার জন্য চেষ্টা করবো আরকি। কয়লা আনতে হবে। এলপিজি, এলএনজি আনতে হবে। এদিকে পাহাড় পরিমাণে বাকি করে গেছে, বকেয়া করে গেছে এই সব মিলিয়ে ফিন্যান্সিয়াল একটা চ্যালেঞ্জ আছে বড়।"
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম পুরো পরিস্থিতির জন্য বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, "দুর্নীতি উচ্ছেদ করেন ভালভাবে চলবে। প্রথমত হচ্ছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর দরকার নেই। তরল জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিলে আমাদের সাশ্রয় হয় ২৮-৩০ হাজার কোটি টাকা। আমরা তা দিয়ে কয়লা আনলে অনায়াসে আমাদের চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি।"
প্রশাসনিক রদবদল নিয়ে বিতর্ক
শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলে হাত দিয়েছে নতুন সরকার। একে একদিকে যেমন দীর্ঘ ১৫ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা, তেমনি অন্যপক্ষের মনে জাগছে গভীর সন্দেহ। প্রশ্ন উঠেছে—এই বিশাল রদবদল কি সত্যিই এক পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের দিকে যাত্রার শুরু, নাকি এটি অতীতের সেই ধ্বংসাত্মক ‘পকেট প্রশাসন’ সংস্কৃতিরই নতুন সংস্করণ? প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলা এই পরিবর্তন এখন দেশজুড়ে এক বড় ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
সমর্থকরা মনে করছেন, জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এ ধরনের শুদ্ধি অভিযানের কোনো বিকল্প নেই। তবে পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, পরিবর্তনের এই বিশাল ঢেউয়ে যদি মেধা আর যোগ্যতার চেয়ে ‘ব্যক্তিগত আনুগত্য’ বা ‘দলীয় পরিচয়’ বেশি প্রাধান্য পায়, তবে তা হবে ভয়াবহ।


