ভারতের আদালতে ১৬টি নথি জমা দিয়েও নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ মুসলিম ব্যক্তি

নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আদালতের কাছে ১৯৫১ সালের এনআরসি ও জমির দলিলসহ ১৬টি নথি পেশ করেছিলেন আমিনুল হক। তবে সমস্ত নথি খতিয়ে দেখে তা খারিজ করে দিয়েছেন গুয়াহাটি হাইকোর্ট।

Jul 3, 2026 - 16:34
 0  5
ভারতের আদালতে ১৬টি নথি জমা দিয়েও নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ মুসলিম ব্যক্তি
×

ভারতের আসাম রাজ্যে নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আদালতের কাছে ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি পেশ করেও শেষ রক্ষা হলো না এক মুসলিম ব্যক্তির। জমা দেওয়া সমস্ত দালিলিক প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখার পর গুয়াহাটি হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছেন, আবেদনকারী নিজেকে আইনগতভাবে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

​গত ৩০ জুন বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামীমা জাহানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেন। আদালত তাঁদের পর্যবেক্ষণে জানান, ১৯৬৪ সালের ভারতীয় বিদেশী আইনের (Foreigners Act) ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠলে নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায়ভার বা বোঝা (Burden of proof) সেই ব্যক্তির ওপরেই বর্তায়। এই মামলায় আবেদনকারীর জমা দেওয়া ১৬টি নথি তাকে ‘বিদেশী নন’ বা ‘ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

মামলার প্রেক্ষাপট:

মামলাটি আমিনুল হক নামক এক ব্যক্তির দায়ের করা রিট পিটিশনের ভিত্তিতে শুরু হয়। এর আগে, গুয়াহাটির ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমিনুলকে ‘বিদেশী’ বলে ঘোষণা করেছিল। ট্রাইব্যুনালের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। আবেদনকারী দাবি করেছিলেন, তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছে।

যেসব নথি জমা দিয়েছিলেন আমিনুল:

আদালতে নিজের সপক্ষে আমিনুল যে ১৬টি নথি জমা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে প্রধান কয়েকটি ছিল:

​১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (NRC) অনুলিপি (যেখানে তাঁর দাদা ও বাবার নাম ছিল)।

​১৯৬৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাবা-মা এবং তাঁর নিজের নাম সংবলিত ভোটার তালিকার সার্টিফাইড কপি।

​১৯৭৩ সালের জমি ক্রয়ের আসল দলিল।

​প্যান কার্ড (PAN Card), ভোটার আইডি এবং একটি স্কুল সার্টিফিকেট।

বাবার মৌখিক সাক্ষ্য ও নামের বানান বিতর্ক:

শুনানির সময় আমিনুলের বৃদ্ধ বাবা আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমিনুলকে নিজের সন্তান হিসেবে শনাক্ত করেন। তবে আদালত এই মৌখিক সাক্ষ্যকে অপর্যাপ্ত বলে খারিজ করে দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ— উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য চেইন লিঙ্ক (দলিল) ছাড়া কেবল মৌখিক বক্তব্য বাবা ও ছেলের আইনি সম্পর্ক বা সংযোগ প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

​আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আমিনুল একজন সাধারণ অভিবাসী শ্রমিক এবং কিছু নথিতে তাঁর বাবা ও দাদার নামের বানানে অসঙ্গতি থাকার কারণে ট্রাইব্যুনাল তাকে বিদেশি ঘোষণা করেছে। নামের বানানের এই তারতম্যকে আদালত খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও মূল সমস্যাটি চিহ্নিত করেছেন অন্য জায়গায়।

আদালতের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ও রায়:

রায়ে আদালত বলেন, “আবেদনকারীর বাবার চার ধরনের নাম (মহিরুদ্দিন শেখ, মাহরুদ্দিন শেখ, মহিরুদ্দিন এবং মহির উদ্দিন) এবং দাদার নামের বানানের অসঙ্গতিকে আদালত বড় করে দেখছে না। কিন্তু আবেদনকারী এটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা (দাদা পাসান আলী, বাবা মহিরুদ্দিন বা আবেদনকারী আমিনুল হক) দোবাকুরা, ঘুঘুডোবা এবং হাসডোবা—এই তিনটি গ্রামের ভোটার তালিকায় ধারাবাহিকভাবে একসঙ্গে লিঙ্কড ছিলেন।”

​আদালত আরও যোগ করেন, ভোটার তালিকার এই ফাঁকফোকর ঢাকতেই কোনো রকম পূর্ববর্তী নথিপত্র ছাড়াই মৌখিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে, পরিবারটি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এছাড়া ২০১৭ সালে ‘হাসডোবা আঞ্চলিক হাইস্কুল’ থেকে দেওয়া যে স্কুল সার্টিফিকেট জমা দেওয়া হয়েছিল, তা ইস্যুকারী প্রধান শিক্ষক আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়ে সত্যতা নিশ্চিত করেননি। ফলে এই নথিটিও গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

​সবকিছু মিলিয়ে চূড়ান্ত শুনানিতে ট্রাইব্যুনালের আগের রায় বহাল রেখে হাইকোর্ট আবেদনকারী আমিনুল হকের পিটিশনটি খারিজ করে দেন। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে আসামের চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা প্রস্তুত করা হলেও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফাই বা কার্যকর করা হয়নি, যার ফলে রাজ্যটিতে নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।