মাদরাসা ব্যবস্থায় যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকার রোধে কঠোর সংস্কারের দাবি: বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির ৬ দফা প্রস্তাবনা
দেশের আবাসিক মাদরাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও বলাৎকার রোধে ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপসহ ৬ দফা সংস্কারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি।
দেশের বিভিন্ন আবাসিক কওমি, আলিয়া ও মহিলা মাদরাসায় ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনাগুলোতে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধ রোধে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপসংস্কৃতি বন্ধ করে অপরাধীদের প্রচলিত আইনের মুখোমুখি করা এবং মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছে দলটি।
রোববার (২৪ মে) এক যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতিতে বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির আহ্বায়ক রিদওয়ান হাসান ও সদস্য সচিব সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির স্থায়ী সমাদানে আলেম সমাজ ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রতি স্পষ্ট আহ্বান জানান।
ইসলামের নৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাসের ওপর আঘাত:
গ্রীন পার্টির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বিগত কয়েক বছরে দেশের বেশ কিছু আবাসিক মাদরাসায় শিশু ও শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়নের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে শিক্ষক বা কর্মচারীদের মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক এবং সাধারণ অভিভাবকদের মনে গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে।
নেতৃদ্বয় স্পষ্ট করেন, "এসব বর্বরোচিত ঘটনা কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং ইসলামের মূল নৈতিক শিক্ষা, মাদরাসা শিক্ষার মূল আদর্শ এবং সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর এক গুরুতর আঘাত। দেশের সিংহভাগ আলেম, শিক্ষক ও মাদরাসা পরিচালক অত্যন্ত সৎ, দ্বীনদার ও দায়িত্বশীল হলেও কিছু বিকৃতমনা ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কিন্তু ভয়াবহ অপরাধের কারণে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নের মুখে পড়ছে।"
ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা:
বিবৃতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় অপরাধ আড়াল করার প্রবণতা নিয়ে। গ্রীন পার্টি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী শিশুদের পক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সামাজিক ইজ্জত বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের দোহাই দিয়ে পরিবারকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে আইনি শাস্তি না দিয়ে কৌশলে এক প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
দলটি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে, ধর্ষণ, বলাৎকার ও যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য ফৌজদারি অপরাধ কোনোভাবেই মাদরাসার অভ্যন্তরীণ সালিশ বা আপসের মাধ্যমে মীমাংসাযোগ্য নয়। অপরাধীকে আড়াল করা বা ঘটনা চেপে যাওয়া মানে পরোক্ষভাবে অপরাধ ও অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া।
বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির সুনির্দিষ্ট ৬ দফা দাবি ও প্রস্তাবনা:
মাদরাসা প্রাঙ্গণে শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে গ্রীন পার্টির পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত দাবিগুলো পেশ করা হয়:
১. আপসহীন আইনি পদক্ষেপ: যৌন নিপীড়নের যেকোনো অভিযোগ বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সামনে আসবামাত্রই বিষয়টি অনতিবিলম্বে পুলিশ ও আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই লোকদেখানো সামাজিক সালিশ বা আপসের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।
২. ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো: ঘটনার পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে অপরাধীর পক্ষ না নিয়ে শতভাগ ভুক্তভোগী শিশু ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং আইনি লড়াইয়ে প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।
৩. স্থায়ী শিক্ষকতা নিষিদ্ধ: এ ধরনের নৈতিকতা বিবর্জিত অপরাধে আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের আজীবনের জন্য দেশের যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা বা যেকোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৪. সিসিটিভি ও নারী তদারকি: প্রতিটি আবাসিক মাদরাসায় বাধ্যতামূলক সিসিটিভি (CCTV) নজরদারি ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ও গোপন অভিযোগ বাক্স স্থাপন, অভিভাবক তদারকি কমিটি গঠন এবং বিশেষ করে মহিলা মাদরাসায় প্রয়োজনীয় নারী পর্যবেক্ষণ ও নারী স্টাফ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. কওমি বোর্ডের শিশু সুরক্ষা নীতিমালা: দেশের সর্বোচ্চ কওমি শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ‘আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও ‘বেফাক’সহ সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কঠোর ‘শিশু সুরক্ষা নীতিমালা’ প্রণয়ন এবং নিয়মিত তদারকি সেল গঠন করতে হবে।
৬. আলেম সমাজের স্পষ্ট অবস্থান: দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজকে এই ব্যাধির বিরুদ্ধে জুমার খুতবাসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ্য এবং আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো ছায়াতলে যেন কোনো অপরাধী আশ্রয় না পায়, তা আলেমদেরই নিশ্চিত করতে হবে।
বিবৃতির শেষে নেতৃদ্বয় বলেন, "মাদরাসা শিক্ষার এই যৌক্তিক সংস্কার মানে কোনোভাবেই মাদরাসাবিরোধিতা নয়। বরং এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো মাদরাসাকে তার প্রকৃত দ্বীনি ও মানবিক আদর্শে ফিরিয়ে আনা। যে সমাজ তার অবুজ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে সমাজ তার ভবিষ্যৎও নিরাপদ রাখতে পারে না।"


