ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের স্ত্রীর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগে এক অধ্যাপকের স্ত্রীকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হওয়া প্রার্থীর পক্ষে খোদ স্বামীই বোর্ড বিশেষজ্ঞের সাথে গোপন বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।

Jul 3, 2026 - 18:51
 0  4
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের স্ত্রীর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
×

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগে এক অধ্যাপকের স্ত্রীকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকা যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে, একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডে চরম পিছিয়ে থাকা এবং অতীতে অকৃতকার্য হওয়া এক প্রার্থীকে চূড়ান্ত করার ঘটনায় ক্যাম্পাসে তুমুল সমালোচনা চলছে। নিয়োগ পাওয়া ফিরোজা নাজনীন ওই বিভাগেরই সিনিয়র অধ্যাপক ও জিয়া পরিষদের প্রভাবশালী নেতা ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী।

​ভারী সব অভিযোগ সামনে আসায় এবং সিন্ডিকেট সভায় সদস্যদের তীব্র আপত্তির মুখে আপাতত ওই পদের চূড়ান্ত নিয়োগপত্র প্রদান স্থগিত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ছাত্রী থাকাকালীন পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন স্বামী!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইসিটি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন ফিরোজা নাজনীন। শিক্ষাজীবনে তিনি ১ম বর্ষের একটি কোর্সে সরাসরি অকৃতকার্য (ফেল) হন। পরবর্তীতে রিটেক ও দুটি কোর্সে মানোন্নয়ন দিয়ে কোনোমতে ৩.৩৮ সিজিপিএ পান। অথচ মানোন্নয়ন ছাড়া তাঁর প্রকৃত সিজিপিএ ছিল মাত্র ২.৯৩। ২য় বর্ষেও একটি কোর্সে মানোন্নয়নসহ ৩.৪২ সিজিপিএ পান তিনি।

​তবে ফিরোজা নাজনীন ৩য় ও ৪থ বর্ষে পদার্পণ করতেই তাঁর ফলাফলে ‘অলৌকিক’ পরিবর্তন আসে। কারণ, ওই দুটি বর্ষে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন খোদ ড. জাহিদুল ইসলাম। স্বামীর অধীনে পরীক্ষা দিয়ে ৩য় বর্ষে এক কোর্সে মানোন্নয়নসহ তাঁর সিজিপিএ লাফিয়ে দাঁড়ায় ৩.৬৪ এবং ৪র্থ বর্ষে রেকর্ড ৩.৮৪!

মেধাবীদের অবমূল্যায়ন, পিছিয়ে থেকেও শীর্ষে:

নিয়োগ বোর্ডে অংশ নেওয়া অন্য প্রার্থীদের তুলনায় একাডেমিক রেজাল্ট ও গবেষণায় আকাশ-পাতাল পিছিয়ে ছিলেন ফিরোজা নাজনীন। তিনি মাস্টার্সে সাধারণ নন-থিসিস গ্রুপের ছাত্রী ছিলেন। অপরদিকে বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে রাকিবুল ইসলাম অনার্স (৩.৯৫) ও মাস্টার্স (থিসিসসহ ৩.৮৮) উভয় পরীক্ষায় বিভাগে প্রথম স্থান অধিকারী গোল্ড মেডেলিস্ট। অন্য প্রার্থী চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু রুম্মান রিফাত অনার্সে ৩.৭৮ ও মাস্টার্সে থিসিসসহ ৩.৯১ রেজাল্টধারী। এই দুই হেভিওয়েট ও যোগ্য প্রার্থীকে টপকে ১ম বর্ষে ফেল করা ড. জাহিদের স্ত্রীকে কীভাবে প্রথম করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্য প্রার্থীরা।

নিয়োগ বোর্ডের আগের রাতে গোপন বৈঠক:

অভিযোগের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে নিয়োগ বোর্ডের আগের রাতের একটি ঘটনা। নিয়োগের ঠিক আগের দিন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ‘দিশা টাওয়ারে’ গিয়ে ড. জাহিদ এই নিয়োগ বোর্ডের অন্যতম বিশেষজ্ঞ সদস্য তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করেন। বোর্ডে প্রভাব খাটানোর উদ্দেশ্যেই এই গোপন বৈঠক হয়েছিল বলে অন্য প্রার্থীদের দাবি। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সভাপতির কাছে সাংবাদিকরা তথ্য জানতে চাইলে তিনি তথ্য দিতে গড়িমসি করেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:

এ বিষয়ে অভিযুক্ত অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গে আমি কেবলই একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছি। নিয়োগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। ফিরোজা যখন ছাত্রী ছিলেন, তখন আমি পরীক্ষা কমিটির সদস্য বা সভাপতি ছিলাম ঠিকই, তবে বিয়ের পর আমি কোনো কমিটিতে ছিলাম না।”

​অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদ মোবাইলে সাড়া না দিলেও গণমাধ্যমকে জানান, ড. জাহিদের সাথে তাঁর দেখা হয়েছিল সত্য, তবে নিয়োগসংক্রান্ত কোনো গোপন কথা হয়নি।

তদন্তের আশ্বাস উপাচার্যের:

বিষয়টি নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আইসিটি বিভাগের যে শিক্ষক নিয়োগটি নিয়ে বিতর্ক ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে, সেটি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিজে যাচাই-বাছাই ও তদন্ত করে দেখব। কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় পাবে না।”