বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দাবি করা এমপি মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে
১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম জাতীয় সংসদে তাঁর বাবাকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ’ দাবি করায় ব্যাপক বিতর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় সংসদে নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ বলে দাবি করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছেন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। সংসদে দেওয়া তাঁর ওই বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা থেকে জানা গেছে—এই সংসদ সদস্যের জন্ম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ১০ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৮১ সালে। ৪৫ বছর বয়সি একজন আইনপ্রণেতার নিজের জন্মেরও আগের যুদ্ধে বাবাকে ‘শহীদ’ দাবি করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
গত রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন চলাকালে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনাকালে নিজের পরিবার মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছিল দাবি করতে গিয়ে এমপি মুনতাকিম বলেন, তাঁর বাবা একজন ‘যুদ্ধে শহীদ’।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই—চারজন মুক্তিযোদ্ধা; আমার দাদারা ১৯ জনের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকদের একজন; কিন্তু আমি আজকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই কেউ অনেক কিছু বলে ফেলে।”
হলফনামার তথ্য ও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা:
সংসদের এই বক্তব্যটি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সামনে আসার পরপরই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে, ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া এই সংসদ সদস্যের বাবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ‘যুদ্ধশহীদ’ হন কীভাবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুল মুনতাকিমের জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। সে হিসাবে বর্তমানে তাঁর বয়স ৪৫ বছরের কিছু বেশি। হলফনামায় তাঁর বাবার নাম উল্লেখ রয়েছে মো. আব্দুল কাদের সৈয়দী।
বিতর্কের পর এমপির ভোলবদল ও ব্যাখ্যা:
বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। জবাবে সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেন, “আমার বাবা এখনও বেঁচে আছেন। মূলত আমার দাদা যুদ্ধশহীদ, তিনি আমার বাবার চাচা হন।”
সংসদের বক্তব্য প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি আসলে বোঝাতে চেয়েছি আমার বাবা-দাদাদের বংশের মধ্যে যুদ্ধে শহীদ আছেন। আমি আক্ষরিক অর্থে আমার নিজের আপন বাবা যুদ্ধে শহীদ—তা বোঝাতে চাইনি।”
বিশিষ্টজন ও বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া:
সংসদ সদস্যের এমন দায়িত্বহীন বক্তব্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষকেরা। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো ধরনের মিথ্যাচার বা বিকৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার ওপর একজন আইনপ্রণেতার দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় (জাতীয় সংসদে) এ ধরনের অসত্য ও বিকৃত তথ্য উপস্থাপন অত্যন্ত দুঃখজনক। এর মাধ্যমে তারা আবার প্রমাণ করলেন যে তারা আসলে কেমন ধারার রাজনীতি করেন।”
অন্যদিকে, এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করে লেখক ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট আখতারুজ্জামান আজাদ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আব্দুল মুনতাকিমের দাবি অনুযায়ী তাঁর দাদাও ‘যুদ্ধে শহীদ’, বাবাও ‘যুদ্ধে শহীদ’। মুনতাকিমের দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হতেই পারেন, এটি অসম্ভব নয়। তবে এমনও হতে পারে—আলোচ্য দাদা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়েছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হওয়া দাদাদের নাতিরাও নিজ নিজ দাদাকে ‘যুদ্ধে শহীদ’ দাবি করতেই পারেন, তা থেকে তাদের নিবৃত্ত করার আইনি সুযোগ নেই।”
তিনি আরও যোগ করেন, পাকিস্তানের কাছে যারা বীর বা শহীদ, বাংলাদেশের কাছে তারা গাদ্দার বা হানাদার। ফলে মুনতাকিমের দাদা একাত্তরে যাদের হাতেই নিহত হন না কেন, কোনো না কোনো পাকিস্তানি মাপকাঠিতে তিনি নিশ্চয়ই ‘শহীদ’ ছিলেন।


