২ কোটি রুপির লোভে প্রেমিকের সহযোগিতায় স্বামীকে হত্যা করলেন স্ত্রী
ভারতের কর্ণাটকে সাবেক এক সেনা সদস্যকে বিষপ্রয়োগে হত্যার পর ২ কোটি রুপির বীমা দাবি করতে ল্যাব ও ফরেনসিক কর্মকর্তা ও ডাক্তারসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
একটি সামান্য মোটরবাইক দুর্ঘটনা মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে রূপ নিল এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। ভারতের কর্ণাটকের বেলাগাভি জেলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক সাবেক সদস্যকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর স্ত্রী ও তাঁর প্রেমিক মিলে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
পরবর্তীতে ঘটনাটিকে ‘হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু’ বলে চালিয়ে দেওয়া এবং নিহতের নামে থাকা প্রায় ২ কোটি রুপির জীবন বীমা (লাইফ ইন্স্যুরেন্স) দাবি করার জন্য তারা হাসপাতালের চিকিৎসক, ল্যাব ও ফরেনসিক কর্মকর্তা এবং সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় চক্রকে নিজেদের দলে ভেড়ায়। গতকাল সোমবার (১৫ ১৫ জুন) বেলাগাভি জেলা পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে।
সাবেক সেনা সদস্য সন্দীপ মাঞ্জারগিকে হত্যা এবং প্রামাণ্য দলিল জালিয়াতির বড় ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের স্ত্রী এবং তাঁর প্রেমিকসহ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত:
গত ১৩ মার্চ এক বাইক দুর্ঘটনায় সামান্য আহত হন সন্দীপ মাঞ্জারগি। প্রথমে তাঁকে হুক্কেরি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী সুমা মাঞ্জারগি তাঁকে ঘাটপ্রভার জেজি হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। এরপর ১৫ মার্চ সন্দীপকে আকস্মিক মৃত ঘোষণা করা হয় এবং হাসপাতালের রেকর্ডে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘হৃদরোগ’ (হার্ট অ্যাটাক) উল্লেখ করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য তাঁর মরদেহ বিআইএমএস হাসপাতালে পাঠানো হলে প্রাথমিক ফরেনসিক রিপোর্টেও দাবি করা হয় যে, শরীরে কোনো বিষ পাওয়া যায়নি এবং মৃত্যুটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণেই হয়েছে। কিন্তু সন্দীপের শরীরে কোনো গুরুতর আঘাত ছিল না এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এভাবে হঠাৎ মারা যাওয়ায় তদন্তকারীদের মনে প্রথম থেকেই খটকা লাগছিল।
খুনির একটি ফেসবুক পোস্টেই ঘুরল মামলার মোড়:
মামলাটি পুরোপুরি মোড় নেয় সুমার প্রেমিক পুন্ডলিক দোম্বারের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাসের কারণে। পুন্ডলিক তাঁর ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়ে প্রশ্ন তোলেন—‘একটি সামান্য দুর্ঘটনায় পড়া মানুষ কীভাবে হুট করে মারা যেতে পারে?’ তাঁর এই পোস্টে এমন কিছু ইঙ্গিত ছিল যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, ঘটনার পেছনে তাঁর কাছে বিশেষ কোনো গোপন তথ্য রয়েছে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর বরাতে জানা যায়, এই পোস্টটি নজরে আসতেই পুলিশ পুন্ডলিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে এবং পুলিশের ম্যারাথন জেরার মুখে সে পুরো হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা ফাঁস করে দেয়।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও বিশাল জালিয়াতি চক্র:
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পুন্ডলিক দোম্বার এবং নিহত সন্দীপ মাঞ্জারগি একে অপরের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন এবং যৌথভাবে একটি হোটেল ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এই সময়েই সন্দীপের স্ত্রী সুমার সঙ্গে পুন্ডলিকের পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তদন্তে জানা গেছে, সন্দীপের নামে তিনটি ভিন্ন বীমা কোম্পানি থেকে প্রায় ২ কোটি টাকার জীবন বীমা পলিসি করা হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ বীমার টাকা হাতিয়ে নিতেই সুমা ও পুন্ডলিক মিলে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে।
জেজি হাসপাতালে সন্দীপের চিকিৎসা চলাকালীন হাসপাতালের বেশ কয়েকজন কর্মচারীও এই অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সুমা ও পুন্ডলিক স্যালাইনের বোতলের মাধ্যমে সন্দীপের শরীরে বিষপ্রয়োগ করেন এবং তাকে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একটি বিশাল জালিয়াত চক্র কাজ শুরু করে। সন্দীপের মৃত্যুকে স্বাভাবিক দেখানোর জন্য মেডিকেল ও ফরেনসিক রেকর্ড বদলে ফেলা হয়। পুলিশের দাবি, ফরেনসিক পরীক্ষা প্রভাবিত করতে এবং সরকারি রিপোর্ট পরিবর্তন করতে এই চক্রটিকে ৩ লাখ টাকারও বেশি ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। অভিযান চালিয়ে পুলিশ ইতোমধ্যেই বিষ বহনকারী পাত্র, সিরিঞ্জ, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য বেশ কিছু অপরাধমূলক আলামত জব্দ করেছে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের তালিকা:
এই নৃশংস জালিয়াতি ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলেন—
১. সুমা মাঞ্জারগি (নিহতের স্ত্রী)
২. পুন্ডলিক দোম্বার (সুমার প্রেমিক)
৩. বাসভরাজ ভাসমে (আরএমপি ডাক্তার)
৪. অশোক গুজনাল (এফডিএ কর্মকর্তা)
৫. আপ্পাসাহেব নায়েক (এফএসএল ক্লার্ক)
৬. চান্নাইয়া আদিবিশ্বামীমাথ (ল্যাবরেটরি সহকারী)
৭. পিএন নাগরাজ (সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার)
৮. শচীন সেলার (পুন্ডলিকের সহযোগী)
৯. রাহুল যোগী (পুন্ডলিকের সহযোগী)।


