ছাত্রলীগের বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে যেভাবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন

২০২৪ সালের ৪ জুলাই ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলা ও হলের তালা ভেঙে রাজপথে নেমে আসেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শাহবাগসহ দেশের প্রধান প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অচল করে গড়ে তোলা হয় তীব্র প্রতিরোধ।

Jul 4, 2026 - 10:22
 0  4
ছাত্রলীগের বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে যেভাবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন
×

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ২০২৪ সালের ৪ জুলাই সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ডাকে সেদিন দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও ‘বাংলা ব্লকেড’ বা সড়ক-রেলপথ অবরোধ পালিত হয়। তৎকালীন শাসক দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সন্ত্রাসী হামলা ও হুমকি উপেক্ষা করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অচল করে দেয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

​দিনব্যাপী রাজপথ কাঁপানো শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন— ‘সংবিধানের মূলধারা, সুযোগের সমতা’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ও ‘দফা এক দাবি এক, কোটা নট কাম ব্যাক’।

ছাত্রলীগের হুমকি ও হলের ফটকে তালা:

৪ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ঠেকাতে মারমুখী অবস্থানে ছিল ছাত্রলীগ। মাস্টারদা সূর্য সেন হলে সকাল ১০টার পর মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। প্রায় আধা ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের ভেতরে জিম্মি করে রাখা হয়। এছাড়া বিজয় একাত্তর হল, জহুরুল হক হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল এবং জসীম উদদীন হলসহ অন্তত ২১টি হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখান।

​সেই রাতের ঘটনা স্মরণ করে ইমরান জোবায়েদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আন্দোলনকারীদের রুখতে ছাত্রলীগ কখনো গেটে তালা ঝুলিয়ে, কখনো হল থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এমনকি রাতভর উত্তেজনার মধ্যে অমর একুশে হল থেকে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সারজিস আলমকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারীরা। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা পিছু হটে।

বরিশালে ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী হামলা:

এদিন দুপুরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে। বিকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগ। মহাসড়ক অবরোধ চলাকালে ছাত্রলীগের এক নেতা মোটরবাইক নিয়ে জোরপূর্বক অবরোধের ভেতর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলায় অন্তত তিনজন সাধারণ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।

রাজধানীসহ সারা দেশে অচলাবস্থা:

সন্ত্রাসীদের দেশি-বিদেশি অস্ত্রের বিপরীতে শিক্ষার্থীরা ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ঢাকার শাহবাগ মোড় থেকে শুরু করে সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেট, পল্টন ও মগবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। ফলে পুরো ঢাকা শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

ঢাকার বাইরেও আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রবল বেগে:

​ময়মনসিংহ: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করে ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দুই ঘণ্টা আটকে রাখেন, যার ফলে ঢাকা-জামালপুর রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

​জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মহাসড়ক ব্লক করে দেন।

​রাজশাহী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নেন।

​অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। খুলনার জিরো পয়েন্টে অবরোধের ফলে ঢাকা, যশোর ও সাতক্ষীরাগামী সড়কের প্রবেশমুখগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

নতুন কর্মসূচি ঘোষণা:

এদিন সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড় ছেড়ে যাওয়ার সময় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “আজ আমাদের কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে।”

​দাবি আদায়ে ৫ জুলাই অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ, ৬ জুলাই শনিবার বিকাল ৩টায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৭ জুলাই (২০২৪) রোববার দেশের সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক ‘ছাত্র ধর্মঘটের’ ডাক দেন সমন্বয়করা। যা পরবর্তীতে চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়।