চোখের জলে ভাসছে ভিটেছাড়া ১৯ পরিবারের স্বপ্ন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার রানিনগর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্ছেদ করা হয়েছে ১৯টি পরিবারকে। ৩৫ বছরের পুরনো বসতি হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁদের।

Jun 23, 2026 - 17:09
 0  2
চোখের জলে ভাসছে ভিটেছাড়া ১৯ পরিবারের স্বপ্ন
×

মাত্র এক দিনের প্রশাসনিক নির্দেশে মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল দীর্ঘ ৩৫ বছরের চেনা বসতি। যে মাটিতে পরম যত্নে ঘর তুলেছিলেন, সন্তানদের বড় করে তুলেছিলেন আর যে জমিতে চাষাবাদ করে এতগুলো বছর সংসার চালিয়েছেন—সেই চিরচেনা মাটি ছেড়ে এখন এক বুক কান্না আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন ১৯টি অসহায় পরিবার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার রানিনগর সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে সম্প্রতি এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চালানো হয়।

​রানিনগরের চর সরন্দাজপুরের পেঙ্গুপাড়া এলাকায় গিয়ে এখন শুধু ধ্বংস আর হাহাকারের চিত্রই চোখে পড়ে। কোথাও ভেঙে ফেলা ঘরের বাঁশ-খুঁটি অবহেলায় পড়ে আছে, কোথাও আবার খাঁ খাঁ করছে চেনা উঠোন। কয়েক দিন আগেও যে আঙিনায় শিশুদের কোলাহল আর গ্রামীণ জীবনের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন ভর করেছে এক শ্মশান নীরবতা।

নিরাপত্তা ও কাঁটাতারের বেড়ার অজুহাত:

স্থানীয় জেলা প্রশাসনের দাবি, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা, নজরদারি বৃদ্ধি এবং নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উচ্ছেদ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বসতিগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি (জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন) থাকায় সেখানে বিএসএফের নজরদারিতে সমস্যা হচ্ছিল এবং সীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালানের ঝুঁকি বাড়ছিল।

​তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, তারা কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন। বছরের পর বছর ধরে সরকারের দেওয়া বৈধ নথিপত্র এবং ভোটার-রেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও আজ তাঁদের কোনো পুনর্বাসন ছাড়াই আকস্মিকভাবে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

শেকড় হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ:

উচ্ছেদ হওয়া প্রবীণ বাসিন্দা আজবার আলি অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমরা এই ভিটেয় আছি। এখানেই চাষবাস করেছি, সংসার বড় করেছি। হঠাৎ করে এভাবে একদিনে উঠে যেতে হবে, তা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন এই পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে জীবন চলবে, আল্লাই ভালো জানেন।”

​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভিটেছাড়া হওয়া ১৯টি পরিবারের মধ্যে অধিকাংশের অন্যত্র মাথা গোঁজার মতো ছোটখাটো বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও, মিলন শেখ ও রাইহান শেখের পরিবারের সামনে দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট। এই দুই পরিবারের স্থায়ীভাবে থাকার মতো দ্বিতীয় কোনো জায়গা বা জমি নেই। ফলে খোলা আকাশের নিচেই এখন দিন কাটছে তাঁদের।

চাষের জমি ও জীবিকা নিয়ে শঙ্কা:

আজবার আলি, তুফান শেখ, ইউনুস আলি ও মতি শেখসহ একাধিক ভুক্তভোগী কৃষক জানান, বসতবাড়ি ভেঙে দেওয়া হলেও তাঁদের একমাত্র জীবিকা তথা চাষের জমিগুলো এখনও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাতেই রয়ে গেছে। বাড়ি দূরে সরে যাওয়ায় এখন প্রতিদিন কঠোর সীমান্ত কড়াকড়ি ও বিএসএফের তল্লাশি পেরিয়ে জমিতে গিয়ে কাজ করা তাঁদের জন্য অসম্ভব ও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

​স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান মাফরোজা বিবি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “এলাকাটি সীমান্তের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। ভবিষ্যতে এখানে বড় পরিসরে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ রয়েছে। দেশের ও মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ওপরের মহলের নির্দেশে তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

​তবে প্রশাসনিক এই জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনি যুক্তির আড়ালে সীমান্তবাসীর শেকড় হারানোর কষ্টটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তব হয়ে উঠেছে। কাঁটাতারের বেড়া হয়তো দুই দেশের সীমান্তকে আরও সুরক্ষিত বা বিচ্ছিন্ন করবে, কিন্তু সেই লোহার বেড়ার নিচে যে বহু মানুষের আজীবনের স্মৃতি, শেকড় আর জীবনসংগ্রামের গল্প চিরতরে চাপা পড়ে গেল—রানিনগরের এই ১৯টি পরিবার তারই এক জ্বলন্ত ও মর্মস্পর্শী উদাহরণ।