৪২ বছর পর পাকিস্তান থেকে নিজ জন্মভূমিতে ফিরলেন নুরু মিয়া

দীর্ঘ ৪২ বছর পর পাকিস্তান থেকে নিজ জন্মভূমি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ফিরেছেন নুরু মিয়া কাজী। চার দশক পর আপনজনকে ফিরে পেয়ে ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মাঝে বইছে আনন্দের অশ্রু।

Jul 3, 2026 - 19:59
 0  4
৪২ বছর পর পাকিস্তান থেকে নিজ জন্মভূমিতে ফিরলেন নুরু মিয়া
×

জীবনের তাগিদে ঘর ছেড়েছিলেন চার দশকেরও বেশি সময় আগে। এরপর সময়ের স্রোতে কেটে গেছে দীর্ঘ ৪২টি বছর। অবশেষে সমস্ত স্মৃতিকাতরতা আর নাড়ির টান বুকে নিয়ে পাকিস্তান থেকে নিজ জন্মভূমি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ৩ নম্বর চরমোহনা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী বাড়িতে ফিরে এসেছেন নুরু মিয়া কাজী। দীর্ঘ ৪২ বছর পর এই আপনজনকে ফিরে পেয়ে তাঁর ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার।

চিঠির যুগ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা:

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলায় জীবিকার কঠোর সন্ধানে নুরু মিয়া কাজী দেশ ছেড়ে প্রথমে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইরানে। সেখানে প্রায় ১০ বছর কঠোর পরিশ্রম করার পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং একপর্যায়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরে তিনি পাকিস্তানের এক নাগরিককে বিয়ে করেন এবং বর্তমানে তিনি দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক।

​বিদেশে থাকলেও নুরু মিয়া তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ও মা-মাটিকে কখনো ভুলে যাননি। প্রবাস জীবনের প্রথম দিকে নিয়মিত চিঠির মাধ্যমে দেশের বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাতেন। তবে পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং নানা প্রতিকূলতার কারণে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এক বুক হাহাকার নিয়ে কেটে যায় বেশ কিছু বছর। এরপর কয়েক বছর আগে আবারও অলৌকিকভাবে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম হন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে দীর্ঘ ৪২ বছর পর তিনি আজ নিজ গ্রামে পা রাখেন।

মায়ের শেষ দেখা না পাওয়ার বেদনা:

নুরু মিয়া কাজীর দেশে ফেরার ব্যাকুলতার মাঝেই এক বড় নিয়তির আঘাত আসে। তাঁর দেশে ফেরার ঠিক তিন বছর আগে প্রিয় মা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। মায়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে না পারার এক চরম আকুলতা ও বেদনা আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। দেশে ফিরেই মায়ের কবর জিয়ারত করে অশ্রুসজল চোখে মোনাজাত করার ইচ্ছার কথা স্বজনদের জানিয়েছেন তিনি।

​কান্নায় ভেঙে পড়ল কাজী বাড়ি:

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর হারানো ভাইকে ফিরে পেয়ে তাঁর ভাই-বোন, নিকট আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। গ্রামের শত শত মানুষ তাঁকে একনজর দেখতে কাজী বাড়িতে ভিড় জমান। ফুল দিয়ে ও জড়িয়ে ধরে তাঁকে বরণ করে নেন স্বজনরা। এ সময় পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের চোখে আনন্দের অশ্রু আর ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

নিজের মাটিতে ফিরতে পেরে নুরু মিয়া যা বললেন:

একান্ত অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে নুরু মিয়া কাজী বলেন, “দীর্ঘদিন পর নিজের স্বাধীন দেশের মাটিতে, নিজের চেনা ঘরে ফিরে আসতে পেরে আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া আদায় করছি। প্রবাসে থাকলেও দেশের মাটি, চেনা মানুষ ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রতিটা মুহূর্ত মিস করেছি। আজ সবাইকে এত বছর পর জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় কাছে পেয়ে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে।”

​দীর্ঘ ৪২ বছরের এই বিচ্ছেদের পর পরিবারের এই পুনর্মিলন শুধু একটি কাজী পরিবারের জন্যই নয়, বরং পুরো রায়পুর এলাকার মানুষের কাছেই একটি পরম আবেগঘন এবং যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।