কারখানার কর্মী থেকে জার্মানির বিশ্বকাপ তারকা
একসময় ভোর ৪টায় উঠে ৮ ঘণ্টা কারখানায় কাজ করতেন ডেনিজ উন্দাভ। আজ আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে জার্মানিকে বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে তোলার নায়ক তিনি।
টানা দুই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের চরম ব্যর্থতা কাটিয়ে অবশেষে আবারও নক-আউট পর্বে পা রেখেছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। জার্মানদের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন এমন একজন ফুটবলার, যাঁর জীবনের গল্প যেকোনো হলিউড সিনেমাকেও হার মানায়। মাত্র কয়েক বছর আগেও যিনি পেটের দায়ে দিনে ৮ ঘণ্টা কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন, আর ফুসরত মিললেই বুট পায়ে নেমে পড়তেন মাঠে। তিনি আর কেউ নন—জার্মানির নতুন আক্রমণভাগের ভরসা ডেনিজ উন্দাভ। চলমান বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ গোলের মহাগুরুত্বপূর্ণ জয়ের ম্যাচে জোড়া গোল করে রাতারাতি পুরো জার্মানদের নয়নমণিতে পরিণত হয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।
কোচের সাথে বিতর্ক এবং মাঠে মোক্ষম জবাব:
অথচ কয়েক মাস আগেও জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে ডেনিজ উন্দাভের কপালে চিন্তার ভাঁজ ছিল। এমনকি জার্মান হেড কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের সঙ্গে মাঠের বাইরে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বেও জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। এক ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তে গোল করার পর উন্দাভ সরাসরি দাবি করেছিলেন, তিনি জার্মানির শুরুর একাদশে (Starting XI) খেলার যোগ্যতা রাখেন।
তবে কোচের ইগোতে লাগায় নাগেলসমান উল্টো সংবাদমাধ্যমের সামনে উন্দাভকে খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন, “ও যদি শুরু থেকে খেলত, তবে হয়তো শেষ মুহূর্তের ওই জয়সূচক গোলটি করতে পারতো না।”
সেই অহংকার আর বিতর্কের জবাব উন্দাভ মুখে দেননি, দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ম্যাচ জেতানোর পর খোদ নাগেলসমানও নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। ম্যাচ শেষে জার্মান কোচ বলেন, “আমি কেন ওর গোল করার এই দুর্দান্ত ছন্দ নষ্ট করব? ও টানা দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে গোল করেছে। এবার ওকে শুরু থেকেই খেলানোর কথা আমি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি।”
ভের্ডার ব্রেমেনের প্রত্যাখ্যান ও কিশোর উন্দাভের কান্না:
তবে উন্দাভের জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অংশটা মাঠের নয়, বরং মাঠের বাইরের লড়াইয়ের। যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর, তখন জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ভের্ডার ব্রেমেনের যুব একাডেমি থেকে তাঁকে নির্মমভাবে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ক্লাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাঁর শারীরিক গড়ন বড্ড ছোটখাটো এবং ফুটবলে তাঁর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সেই প্রত্যাখ্যান কিশোর উন্দাভকে ভেতর থেকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
ভোর ৪টার শিফটে কারখানার শ্রমিক:
কিন্তু হাল ছাড়েননি উন্দাভ। নতুন উদ্যমে নিজেকে গড়ে তুলে ১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব ‘হাভেলসে’তে যোগ দেন। সেখানে সপ্তাহে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ১২০ পাউন্ড (বাংলাদেশি টাকায় যা খুবই সামান্য)। শুধু ফুটবল খেলার এই অর্থ দিয়ে জার্মানির মতো দেশে টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁকে বেছে নিতে হয়েছিল কারখানার শ্রমিকের জীবন।
বেলজিয়ান গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করে উন্দাভ বলেছিলেন, “আমি প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠতাম। এরপর সোজা কারখানায় গিয়ে টানা ৮ ঘণ্টা শ্রমিকের কাজ করতাম। কারখানার ডিউটি শেষ করে কোনোমতে ছুটে যেতাম ক্লাবের অনুশীলনে। অনুশীলন শেষ করে রাত ৮টার দিকে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরতাম। পরদিন আবার একই রুটিন। বেঁচে থাকার জন্য আমাকে এই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। কারণ শুধু ফুটবলের টাকায় তখন আমার পেট চলত না।”
ভাগ্যের চাকা বদল ও বিশ্বমঞ্চে উত্থান:
২০২০ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব ‘ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়াজে’ যোগ দেওয়ার পর থেকে মূলত পেশাদার ফুটবলার হিসেবে উন্দাভের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই গোলমেশিনকে।
একসময় কারখানায় যন্ত্রের সাথে লড়াই করা সেই ডেনিজ উন্দাভ আজ জার্মানির কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন সারথি। বুন্দেসলিগা মাতিয়ে এখন জার্মানির জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার বড় স্বপ্ন দেখছেন এই অদম্য লড়াকু ফুটবলার।


