শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কতটা সম্ভব?

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান নিয়ে আলোচনা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার সম্ভাবনা কতটুকু? জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতামত নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

Jun 21, 2026 - 14:24
 0  8
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কতটা সম্ভব?
×

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন থাকলেও, বর্তমান বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪ মাস পার হয়েছে। এই স্বল্প সময়ে একদিকে যেমন নতুন সরকারের বড় কোনো ভুল-ভ্রান্তি জনমনে স্পষ্ট হয়নি, অন্যদিকে তেমনি গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো হাসিনাবিরোধী অবস্থানে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ।

​বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় জনমত কিংবা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি—কোনো পরিস্থিতিই এখন পর্যন্ত হাসিনা বা আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার অংশ বলেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।

অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অপরাধের বিচার: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার প্রসঙ্গটি এই মুহূর্তে দেশের প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, “দেশে বিগত শাসনামলে যে অপরাধ, চরম দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শেখ হাসিনা হোক আর যে-ই হোক, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে, তিনি যত বড় ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।”

​তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্য কখনোই আরেক ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা চাটুকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে না। গণতন্ত্রের নামে নতুন কোনো স্বৈর্তান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হলে সেটিও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হবে।”

​আত্মসমালোচনা ও অনুতাপের অভাব: মাহমুদুর রহমান মান্না

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ বর্তমানে খুবই সীমিত। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যে আলোচনা, তা মূলত দেশের বাইরে, বিশেষ করে সীমান্তের ওপারের কিছু মহল, মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী পলাতক নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দেশের ভেতরে এর কোনো ভিত্তি নেই।”

​মান্না আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠন ছিল এবং তাদের বহু নেতাকর্মী এখনো দেশেই রয়েছেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির মধ্যে কোনো ধরনের আত্মসমালোচনা, অনুতাপ বা নিজেদের ভুল ধারণার পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। তারা এখনো অতীতের একগুঁয়ে অবস্থান থেকে সরে আসেনি, যা তাদের সাধারণ জনগণ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবে তারা যদি নিজেদের অতীতের ভুল-ত্রুটি উপলব্ধি করে সংশোধনের উদ্যোগ নিত এবং পরিশীলিত রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে আসত, তাহলে হয়তো মানুষ ভবিষ্যতে তাদের ভিন্নভাবে বিবেচনা করলেও করতে পারত।”

বিষয়টি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের নয়, জবাবদিহির: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিন

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিন মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কোনো রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্ন নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে জবাবদিহি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারও কূটনৈতিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, কারণ জুলাই গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর আইনি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।”

​তিনি যোগ করেন, “দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে সবার আগে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত নেবে তিনি বা তাঁর দল ভবিষ্যতে রাজনীতি করার যোগ্যতা রাখবে কিনা। জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্ম এখনো মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত সক্রিয় ও সংগঠিত। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর রাজনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।”

সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের জবাবদিহির চ্যালেঞ্জ: আলতাফ পারভেজ

রাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই যে তা পূরণের জন্য আকস্মিকভাবে নতুন কোনো শক্তির আবির্ভাব প্রয়োজন হবে। তবে এটাও সত্য যে, আওয়ামী লীগ একটি পুরোনো ও বড় রাজনৈতিক দল। শুধু কোণঠাসা বা নিষিদ্ধ করে রাখলেই দলটি স্থায়ীভাবে ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। তারা অবশ্যই রাজনীতিতে স্পেস পাওয়ার চেষ্টা করবে।”

​তবে দলটির প্রধান সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা বা দল হিসেবে ফিরে আসার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় বাধা হলো গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল নিয়ে জবাবদিহি। জনগণের সামনে সেই সময়ের গুম, খুন, লুটপাট ও ভোট ডাকাতির ব্যাখ্যা দিতে হবে। আমার মনে হয় না দলটি খুব সহজে সেই জবাবদিহির পথ বেছে নেওয়ার সাহস দেখাবে।”

​দেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হতে পারে: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্লেষক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের এখনই দেশে সক্রিয় রাজনীতি করার মতো ন্যূনতম অনুকূল পরিস্থিতি নেই। কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্টেকহোল্ডাররা এ প্রশ্নে এখনো শর্তহীনভাবে একমত। তবে তাই বলে তারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বসে থাকবে না। তারা নানাভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের গোপন সমর্থন ও অর্থায়নে নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই চক্রান্ত মোকাবিলা করতে হবে।