পাগলা মসজিদে দানের টাকার নতুন রেকর্ড

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩টি লোহার সিন্দুক ও ৩টি ট্রাঙ্ক খুলে এবার রেকর্ড ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। সেই সাথে মিলেছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা।

Jun 27, 2026 - 22:44
 0  4
পাগলা মসজিদে দানের টাকার নতুন রেকর্ড
×

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সগুলোতে এবার দানের অংকে সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ছয় মাস পর মসজিদের ১৩টি লোহার সিন্দুক এবং ৩টি অস্থায়ী ট্রাঙ্ক খুলে পাওয়া গেছে নগদ ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। নগদ এই বিপুল পরিমাণ দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি দানবাক্সগুলোতে মিলেছে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা।

​এর আগে, গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর সর্বশেষ যখন এই দানবাক্সগুলো খোলা হয়েছিল, তখন পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে এবার দানের পরিমাণ এক লাফে প্রায় ৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

​আজ শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টার দিকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের উপস্থিতিতে সিন্দুকগুলো খোলা হয়। এ সময় রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, মাদ্রাসার ছাত্র এবং র‍্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর শতাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

টাকা গণনার কর্মযজ্ঞ ও নিরাপত্তা:

কিশোরগঞ্জ রূপালী ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) মোহাম্মদ হারেসী জানান, সকাল থেকে শুরু হওয়া এই টাকা গণনার কাজে ব্যাংকের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মসজিদের অধীনস্থ মাদ্রাসার দুই শতাধিক ছাত্র অংশ নেন। দুপুর ১২টার মধ্যেই প্রাথমিক ধাপে ১০ কোটি টাকা গুনে ব্যাংকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। টাকার পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় চূড়ান্ত গণনা শেষ হতে রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

​কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ গণনার পুরো প্রক্রিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র‍্যাব ও ব্যাটালিয়ন আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শতাধিক কর্মকর্তা ও জওয়ান সিন্দুক খোলা থেকে শুরু করে ব্যাংকে টাকা পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সময় কড়া পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন।

পাগলা মসজিদের ঐতিহাসিক পটভূমি:

কিশোরগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীর তীরে হারুয়া এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের বয়স দুইশ বছরেরও বেশি। ইতিহাস অনুযায়ী, শহরের হয়বতনগর জমিদার বাড়ির পূর্বপুরুষ এবং তৎকালীন সময়ের আধ্যাত্মিক সাধক জিল কদর খান (যিনি স্থানীয়দের কাছে 'পাগল পীর' বা 'পাগলা সাহেব' নামে পরিচিত ছিলেন) নরসুন্দা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা একটি উঁচু টিলায় তাঁর আস্তানা গেড়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ওই পবিত্র আস্তানাটি মসজিদ হিসেবে রূপ নেয়।

​কালক্রমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ-বিদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এটি এক গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের পবিত্র স্থান হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের মাঝে একটি লোকবিশ্বাস রয়েছে যে, মনস্কামনা বা মকসুদ পূরণের জন্য এই মসজিদে মানত করলে বা দান করলে মনের বাসনা পূর্ণ হয়। আর এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে নগদ টাকা, স্বর্ণ ও গবাদিপশু মানত করতে ভিড় জমান।

দানকৃত অর্থ ব্যয়ের খাত ও ৩০ হাজার মুসল্লির আধুনিক কমপ্লেক্স:

টাকার ব্যবহার সম্পর্কে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, “পাগলা মসজিদে সাধারণ মানুষের দান করা এই টাকা সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসহায়-দুস্থ মানুষ, জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যাধিগ্রস্তদের চিকিৎসা, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাভাতা এবং বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা ও এতিমখানার উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করা হয়ে থাকে।”

​তিনি আরও জানান, ঐতিহাসিক এই মসজিদটিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের একটি সর্বাধুনিক সুবিশাল 'পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্স' নির্মাণের মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। যেখানে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ একসাথে ৩০ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই পাগলা মসজিদের নিজস্ব ফান্ডে ব্যাংকে ১১৪ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত (FDR) হিসেবে জমা রয়েছে। এছাড়া প্রবাসীদের সুবিধার্থে চালু করা অনলাইন ডোনেশন সিস্টেম থেকেও ইতিমধ্যে ৫ লাখের বেশি টাকা ফান্ডে জমা হয়েছে বলে জানান তিনি।