সাংবাদিকের ওপর ছাত্রদলের হা'মলার অভিযোগ
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক ও শিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেনের ওপর অতর্কিত হামলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পূর্বশত্রুতা ও সংবাদ প্রকাশের জেরে মোয়াজ্জেম হোসেন (৪০) নামের এক শিক্ষক ও সাংবাদিকের ওপর দুই দফা অতর্কিত বর্বরোচিত হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ছাত্রদলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে।
গতকাল শনিবার (২৭ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে কলাপাড়া পৌর শহরের মাছবাজার-সংলগ্ন সদর রোড এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে।
আহত মোয়াজ্জেম হোসেন নূর মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং জাতীয় দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’র কলাপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন।
মোবাইল দোকানে বসে থাকা অবস্থায় দুই দফা হামলা:
আহত সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন কলাপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানান, গতকাল রাত ৮টার দিকে তিনি শহরের একটি মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানে ব্যক্তিগত কাজে বসেছিলেন। এ সময় হঠাৎ উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ফাহিম, ছাত্রদল নেতা মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস এবং কলাপাড়া সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বেলালের নেতৃত্বে ৭ থেকে ৮ জনের একটি সশস্ত্র দল দোকানে প্রবেশ করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা মোয়াজ্জেম হোসেনের ওপর প্রথম দফায় চড়াও হয়ে মারধর শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পর সদর রোড এলাকায় দ্বিতীয় দফায় তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
এতে তিনি মাথা ও শরীরে গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত জখম হন। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ও প্রতিবেশীরা তাঁকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি করেন। তবে কলাপাড়া হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁর অবস্থার অবনতি দেখলে ওই রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) স্থানান্তর করেন।
হামলার নেপথ্য কারণ:
সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “গত ২১ জুন শহরের বাদুরতলী স্লুইসগেট এলাকায় আমার বোনের বসতবাড়িতে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ওই ঘটনার বিবরণ দিয়ে আমি নিজস্ব করাপোন্ডেন্ট হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করি। এই সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই স্থানীয় ছাত্রদলের ওই চক্রটি আমার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল এবং এর জের ধরেই তারা গতকাল রাতে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে।”
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও অস্বীকার:
হামলার বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ফাহিমের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
তবে অপর অভিযুক্ত কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বেলাল তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেন, “আমি এলএলবি পরীক্ষায় অংশ নিতে সারাদিন বরিশালে অবস্থান করছিলাম। সন্ধ্যার পর আমি কলাপাড়ায় ফিরে ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারি। আমাকে পরিকল্পিতভাবে এই রাজনৈতিক নোংরামির ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। হামলায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস:
এদিকে সাংবাদিকের ওপর এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিরা।
পটুয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. জাকারিয়া আহমেদ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। আমরা ইতিমধ্যেই ঘটনার খোঁজখবর নিচ্ছি। আমাদের দলীয় তদন্তে ঘটনার সাথে যারাই জড়িত প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মো. হুমায়ুন শিকদার বলেন, “সাংবাদিক বা শিক্ষকের ওপর কোনো ধরনের হামলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা স্পষ্ট করে বলছি, অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত দলীয় ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে খোঁজখবর নিচ্ছি। সাংবাদিক সমাজ আমাদের সমাজের দর্পণ। এই বর্বরোচিত ঘটনায় জড়িত কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “সাংবাদিকের ওপর হামলার খবর পেয়েই ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। এই ঘটনায় নিহতের স্বজন বা আহতের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলেই দ্রুত মামলা রুজু করা হবে এবং আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের তাৎক্ষণিক অভিযান শুরু হবে।”


