সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, সব ইহুদিই তোমার ওপর বিরক্ত: নেতানিয়াহুকে ট্রাম্প
গাজ্জা যুদ্ধ ও শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে চরম অপমান করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের অন্দরমহলের এসব তথ্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে নতুন বই ‘রেজিম চেঞ্জ’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাহ্যিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নেপথ্যে থাকা এক চরম উত্তপ্ত ও নাটকীয় ঘটনার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। গাজ্জা যুদ্ধ চলাকালীন এক গোপন ফোনালাপে নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, “সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম)। এমনকি সব ইহুদিও তোমার ওপর বিরক্ত।”
আমেরিকার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর দুই বিখ্যাত সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথন সোয়ানের যৌথভাবে লেখা ‘রেজিম চেঞ্জ’ (Regime Change) নামের একটি নতুন বইয়ে এই সংবেদনশীল তথ্যটি ফাঁস করা হয়েছে। স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) বইটি প্রকাশের পর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
কুশনারের ক্ষোভ ও গাজ্জা শান্তি পরিকল্পনা:
বইটির তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরাইলের এক আকস্মিক বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে। ওই হামলায় কাতারের নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য নিহত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এতে ট্রাম্পের জামাতা ও তৎকালীন উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বলেছিলেন, “আমি আর এই মধ্যস্থতায় থাকছি না। ইসরাইলিরা সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছে।”
তবে পরবর্তীতে কুশনার এই পরিস্থিতিকে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির মোক্ষম সুযোগ হিসেবে লুফে নেন এবং গাজ্জায় যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে কুশনার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করেন। এরপরই ট্রাম্প সেই প্রস্তাব মেনে নিতে নেতানিয়াহুকে ফোন করেন।
ফোনালাপে ট্রাম্পের রুক্ষ আচরণ:
বইটিতে দাবি করা হয়, সেই ফোনালাপে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং আমেরিকার শান্তিদূত স্টিভ উইটকফও যুক্ত ছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে নেতানিয়াহু গড়িমসি করলে ট্রাম্প সরাসরি তাকে আক্রমণ করে বসেন।
ট্রাম্প বলেন, “সবাই তোমার ওপর বিরক্ত, বিবি। সব ইহুদিই তোমার ওপর বিরক্ত। এমনকি এই ফোনালাপে থাকা দুই ইহুদিও (কুশনার ও উইটকফ) তোমার ওপর চরম বিরক্ত। তুমি এখন আর এই চুক্তি থেকে পিছু হটতে পারবে না। ইসরাইলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু আমি। সবাই তোমাকে ঘৃণা করলেও আমি তোমার পাশে থেকেছি। সুতরাং, এটি ইসরাইলের জন্য একটি দারুণ চুক্তি, এটা তোমাকে মানতেই হবে।”
এই কড়া হুমকির ঠিক দুই দিন পর, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যৌথভাবে সেই গাজ্জা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেরও সমর্থন পায়।
সিচুয়েশন রুমের তথ্য ফাঁসে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প:
‘রেজিম চেঞ্জ’ বইটিতে শুধু এই ফোনালাপই নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের হোয়াইট হাউস সিচুয়েশন রুমের একাধিক গোপন ও সংবেদনশীল আলোচনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এপস্টেইন ফাইলস এবং ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এতে স্থান পেয়েছে।
বইয়ের দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন বিমান হামলার আগে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে এক বৈঠক বসে। সেখানে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে প্ররোচিত করে বলেছিলেন, “ইরানে সরকার (রেজিম) পরিবর্তনের এটাই উপযুক্ত সময়।” তবে সিচুয়েশন রুমের পরবর্তী বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নেতানিয়াহুর ওই মূল্যায়নকে ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমের অতি গোপনীয় কথোপকথনের রেকর্ড এভাবে নিখুঁতভাবে বইয়ে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ভীষণ ক্ষুব্ধ’ হয়েছেন এবং এর পেছনে থাকা সূত্রকে খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন।


