‘শুধু ক্ষমা নয়, জামায়াতের বিচারও হতে হবে’:

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল— জাতীয় সংসদে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের পর জামায়াত নেতার পাল্টা আক্রমণাত্মক জবাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

Jul 1, 2026 - 13:04
 0  9
‘শুধু ক্ষমা নয়, জামায়াতের বিচারও হতে হবে’:
×

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দলগতভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অনুশোচনা প্রকাশ’ বা ‘ক্ষমা প্রার্থনা’ না করার বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনাকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্যের পর জামায়াতের শীর্ষ নেতার পাল্টা ও অত্যন্ত আক্রমণাত্মক জবাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন তোলপাড় চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন বাম দলের নেতারা বলছেন— জামায়াতের জন্য শুধু ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়, দল হিসেবে তাদের বিচারও হতে হবে।

​সংসদে যা বলেছিলেন মির্জা ফখরুল:

জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিএনপি নিয়ে সমালোচনার আগে আপনাদের নিজেদের দিকে একবার ফিরে তাকানো দরকার। ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য আপনারা একবারও তো ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। জাতির সামনে আপনাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল। এটা করলে কিন্তু আজকের এই সমস্যা হতো না। আপনাদের নেতা প্রফেসর গোলাম আজম তখন বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে আমরা ভুল করিনি। আমার মনে হয় এখনও সময় আছে। আপনারা এখনও ভেবে দেখতে পারেন।” তিনি আরও যোগ করেন, একাত্তরের অবস্থান স্বীকার করে নিলে জামায়াতের জন্য রাজনীতি অনেক সহজ হয়ে যাবে।

​‘ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন’: জামায়াত নেতার পাল্টা আক্রমণ

মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও এগারো দলীয় জোটের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় পাল্টা আক্রমণ করে বলেন:

​“আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন। আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইবো কেন? সেই হিসেবে আপনার বাবাও অপরাধী, এই অভিযোগ আছে। সুতরাং আপনাদের কথা সতর্কভাবে বলা উচিত।”

​হামিদুর রহমান আযাদ আরও দাবি করেন যে, ফ্যাসিবাদীরা যে সুরে কথা বলেছে, সেটি বাংলাদেশের জনগণ জুলাই আন্দোলনের সময় বাতিল (রিজেক্ট) করে দিয়েছে। তাই এখন পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ হবে না।

​‘নিঃশর্ত ক্ষমা ও বিচার দুটিই প্রয়োজন’ — সাইফুল হক:

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “পাকিস্তান হানাদারদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়ক হিসেবে জামায়াতের হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার সহায়ক ভূমিকার একটা প্রামাণিক ইতিহাস বা দলিলপত্র আছে, যা মানুষ জানে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের যে অবস্থান অন্যায় ছিল, তার জন্য কোনো ‘যদি-কিন্তু’ ছাড়াই নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।”

​তিনি আরও বলেন, শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করলেই পার পাওয়া যাবে না। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি জামায়াতেরও দল হিসেবে বিচার হতে হবে। এটি কোনো শোধ-প্রতিশোধের বিষয় নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন।

​‘জামায়াতের রাজনীতি করার অধিকার নেই’ — রুহিন হোসেন প্রিন্স:

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, জামায়াতের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন তুলে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে ‘অক্সিলারি ফোর্স’ বা সহযোগী বাহিনী হিসেবে আলবদর ও আলশামসের নাম উল্লেখ ছিল, যার সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোনো নৈতিক অধিকারই নেই।

​‘জামায়াত নামটিই দলটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায়’ — ড. বদিউল আলম মজুমদার:

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জামায়াত নামটির সঙ্গেই পাকিস্তানপন্থীদের পক্ষ নেওয়ার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, “তারা যদি একাত্তরের দায়মুক্ত হতে চায়, তবে জামায়াত নাম যতদিন থাকবে একাত্তরের সেই দায় তারা এড়াতে পারবে না। তাদেরকে নতুন কোনো নামে, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আবির্ভূত হতে হবে বা নিজেদের রি-ইনভেন্ট (পুনর্নির্মাণ) করতে হবে।”

​তরুণ প্রজন্মের ভাবনা:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ক্ষমা চাওয়ার প্রথম শর্ত হলো সত্য ও নিজেদের ভুল স্বীকার করা। কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার বলেন, “জামায়াতকে নির্বাচনের আগে ‘আমাদের সুযোগ দিন’ বলতে শোনা গেলেও তারা কখনো অকপটে স্বীকার করেনি যে ১৯৭১ সালে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভুল বা দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ছিল। সত্য স্বীকার না করে শুধু ক্ষমা চাওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, প্রকৃত অনুশোচনা নয়।”