বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে মিডিয়া ফ্রেমিংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন তাঁর চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে অনলাইন মিডিয়ার সংবাদের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফেসবুকে আইনি প্রক্রিয়া ও ব্যয়ের প্রকৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জানুন বিস্তারিত।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন তাঁর উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাকালীন চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে কয়েকটি অনলাইন সংবাদ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, কিছু মিডিয়া বৈধ, নিয়মতান্ত্রিক ও সম্পূর্ণ আইনগত একটি বিষয়কে এমনভাবে ‘মিডিয়া ফ্রেমিং’ করেছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, শঙ্কা ও সন্দেহ তৈরি করেছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে তাঁর আইনি অধিকার এবং চিকিৎসার খরচের প্রকৃত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা তাঁর বিবৃতিতে মন্ত্রীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইন, নিজের জটিল শারীরিক অবস্থা এবং থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাড হাসপাতালে হওয়া খরচের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন।
মন্ত্রীদের চিকিৎসা ব্যয়ের আইনি প্রক্রিয়া:
ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন তাঁর ফেসবুক পোস্টে জানান, বাংলাদেশে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড डिप्टी মিনিস্টার্স (রিমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় মন্ত্রিসভার সদস্যরা দেশ বা বিদেশে যেকোনো স্থানে চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ সরকারি কোষাগার থেকে পাওয়ার আইনি অধিকার রাখেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশের একটি উপযুক্ত সরকারি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই বোর্ডের চিকিৎসকেরা যদি প্রত্যয়ন করেন যে সংশ্লিষ্ট রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা বা প্রযুক্তি দেশে নেই, কেবল তখনই সরকার প্রধানের চূড়ান্ত অনুমোদনে বিদেশে চিকিৎসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিদেশ থেকে ফিরে খরচের প্রকৃত রসিদ ও ভাউচার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেওয়ার পর তা সরকারিভাবে পরিশোধ বা সমন্বয় করা হয়। তিনি মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করায় আইনানুসারেই সরকার এই ব্যয় বহন করেছে।
জটিল হৃদরোগ ও দেশে চিকিৎসার অভাব:
নিজের গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থা তুলে ধরে সাবেক উপদেষ্টা বলেন, “আমি দীর্ঘদিন যাবত জটিল হৃদরোগ, হাই ডায়াবেটিস (দিনে তিনবার ইনসুলিন নিতে হয়) ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছি। ২০১৫ সালে আমার হার্টে রিং (স্টেন্ট) বসানো হয় এবং এ পর্যন্ত ৫ বার আমার এনজিওগ্রাম করা হয়েছে।”
তিনি জানান, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই তিনি পুনরায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তখন সরকারি হাসপাতালের স্পেশালিস্ট ডাক্তারদের বোর্ড গঠন করা হলে পরীক্ষায় তাঁর হৃদস্পন্দন অনিয়মিত (Atrial Fibrillation / AFib) ধরা পড়ে। মেডিকেল বোর্ড লিখিতভাবে জানায় যে, এই রোগের জন্য ‘ক্যাথেটার এবলেশন’ নামক একটি জটিল অপারেশন আবশ্যক, যার অত্যাধুনিক লেটেস্ট মেশিন ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি ওই সময়ে দেশে ছিল না। ফলশ্রুতিতে চিকিৎসকেরা তাঁকে আবুধাবির একটি মার্কিন হাসপাতাল অথবা থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাড হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বিদেশে চিকিৎসা ও দুই দফার খরচের বিবরণ:
ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন তাঁর থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাড হাসপাতালের চিকিৎসার খরচকে দুটি ধাপে বিন্যস্ত করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
প্রথম ধাপ (১৭ লক্ষ টাকা): বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে থাইল্যান্ডে যাওয়ার পর পুনরায় এনজিওগ্রাম করা হয়। তখন তাঁর হৃদপিণ্ডের দেওয়ালে রক্ত জমাট বেঁধে থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। ডাক্তার জানান, অপারেশন না করলে ব্রেইন স্ট্রোক বা হার্ট ফেলের আশঙ্কা রয়েছে। তবে পবিত্র হজের সময় নিকটবর্তী হওয়ায় রক্ত জমাট দূর করার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তিনি দেশে ফিরে হজের দায়িত্ব পালন করেন। এটুকু পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা।
অপারেশন ও দ্বিতীয় ধাপ (৬৫ লক্ষ টাকা): হজের দায়িত্ব পালন শেষে পুনরায় অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত জানুয়ারি মাসে তাঁর চূড়ান্ত অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। বামরুনগ্রাড হাসপাতালে এই ধাপে বিল আসে প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা। থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু ডিস্কাউন্ট দেয়, যার জন্য তিনি দূতাবাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সহযাত্রী ও হোটেলের খরচ:
তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে পরিষ্কার করেছেন যে, আইনানুসারে সরকার শুধুমাত্র তাঁর হাসপাতালের মূল বিল, অপারেশন বিল ও মেডিসিনের প্রকৃত ব্যয় বহন করেছে। এর বাইরে তাঁর পরিচর্যার জন্য সাথে যাওয়া সহযাত্রীর সমস্ত খরচ তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করেছেন। এমনকি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাংককের হোটেলে বসবাসের বিল, খাওয়ার বিল এবং যাতায়াত খরচও তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরিশোধ করেছেন।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “সরকার প্রদত্ত প্রতিটি পয়সার প্রকৃত বিল, ভাউচার ও অফিসিয়াল রিসিভট আমার কাছে সুরক্ষিত আছে। যে কেউই চাইলে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব ব্যয়ের সত্যতা অনুসন্ধান করতে পারবেন। আমি উপদেষ্টা হিসেবে সততা, নিষ্ঠা, নির্লোভ ও নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সরকারি কোনো অর্থ আত্মসাৎ বা তসরুপ করার প্রশ্নই ওঠে না। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বিষয়টি বোঝার তৌফিক দান করুন।”


