দরিদ্র শিক্ষার্থীর নামে বরাদ্দ বাইসাইকেল নাতিকে দিলেন জামায়াত নেতা

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে এডিপি বরাদ্দের সামগ্রী বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এক মাদরাসাছাত্রের বাইসাইকেল জালিয়াতি করে নিজের নাতনিকে দিয়েছেন উপজেলা জামায়াত আমির।

Jul 2, 2026 - 01:04
 0  3
দরিদ্র শিক্ষার্থীর নামে বরাদ্দ বাইসাইকেল নাতিকে দিলেন জামায়াত নেতা
×

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিশেষ বরাদ্দের সরকারি সামগ্রী বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সরকারি অর্থে কেনা বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন, ছাগল ও হুইলচেয়ার প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে না পৌঁছে স্থানীয় জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের স্বজনদের পকেটে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে।

​এই দুর্নীতির কেন্দ্রে রয়েছেন কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা তাজুল ইসলাম। তিনি এক দরিদ্র মাদরাসাছাত্রের নামে বরাদ্দ হওয়া বাইসাইকেল জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেই মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করে তুলে নিজের নাতনিকে উপহার দিয়েছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের তোপের মুখে গতকাল বুধবার দুপুরে বাইসাইকেলটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ফেরত দিতে বাধ্য হন ওই জামায়াত নেতা।

অনুসন্ধানে থলের বিড়াল:

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোটচাঁদপুর কামিল মাদরাসার সপ্তম শ্রেণীর দরিদ্র ছাত্র সাইমুন ইসলামের নামে একটি বাইসাইকেল বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্র সাইমুনকে সেই সাইকেল না দিয়ে জামায়াত নেতা মাওলানা তাজুল ইসলাম সাইমুনের জন্মনিবন্ধনপত্র ব্যবহার করে নিজেই স্বাক্ষর দিয়ে সাইকেলটি তুলে বাড়ি নিয়ে যান এবং নিজের নাতনি মারিয়াকে ব্যবহার করতে দেন।

​ভুক্তভোগী মাদরাসাছাত্র সাইমুন ইসলাম জানায়, তার সাইকেলটি প্রথমে তাকে দেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি জানাজানি ও জানাজানি হওয়ার পর বুধবার তড়িঘড়ি করে জামায়াত নেতা বাইসাইকেলটি তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। শুধু জামায়াত আমিরই নন, স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাও বরাদ্দকৃত সাইকেল, সেলাই মেশিন ও স্প্রে মেশিন নিজেদের স্বজনদের মাঝে বাটোয়ারা করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।

বক্তব্য বদলে জামায়াত আমিরের দায় স্বীকার:

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত নেতা মাওলানা তাজুল ইসলাম প্রথমে দাবি করেন, সাইকেলটি তাঁর এক প্রতিবেশীকে দেওয়া হয়েছিল। তবে পরক্ষণেই বক্তব্য বদলে নিজের অপরাধ স্বীকার করে তিনি বলেন— তাঁর ছেলে বেকার এবং আর্থিক সংকটে থাকায় সাইকেলটি তাঁর পুতনি (নাতনি) মারিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। একই সাথে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, বরাদ্দকৃত এসব মালামাল জামায়াত ও বিএনপি নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

​তার এই কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কোটচাঁদপুর কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ও সাবেক জামায়াত নেতা শের আলী। তিনি বলেন, “মাওলানা তাজুল ইসলাম মোটেও কোনো দরিদ্র মানুষ নন। তিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, শহরে নিজস্ব বাড়ি আছে, সন্তানরাও ভালো চাকরি করেন। দরিদ্রদের হকের বাইসাইকেল কৌশলে নিজের স্বজনকে দেওয়ার ঘটনা একজন দায়িত্বশীল মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই মানায় না।”

তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থার দাবি বিএনপির:

সরকারি মালামাল দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগাভাগির এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল। তিনি বলেন, “সরকারি বরাদ্দ যদি দলীয় নেতাকর্মীরা এভাবে ভাগাভাগি করে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং একটি খারাপ নজির। প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে এর পেছনে জড়িত সবার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”

ইউএনও-এর বক্তব্য:

কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “সাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে সাইকেলটি ফেরত আনা হয়েছে। এটি এখন নতুন করে প্রকৃত উপকারভোগী সেই মাদরাসাছাত্রের মাঝে বিতরণ করা হবে।”

​তিনি আরও যোগ করেন, বাইসাইকেল ছাড়াও সেলাই মেশিন, ছাগল ও কৃষকদের স্প্রে মেশিন বিতরণে আর কোনো অনিয়ম বা দলীয় বাটোয়ারা হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখতে খোদ প্রশাসন মাঠে নেমেছে।