মায়ের পাশেই তিন মেয়ের শেষ ঠিকানা, সবার কাছে দোয়া চাইলেন ছেলে

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার মা শাহীনুর বেগম ও তাঁর তিন মেয়ের দাফন সম্পন্ন হয়েছে কুমিল্লার হোমনায়। পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান জুনায়েদের হৃদয়বিদারক আরজি ও মামলার বিস্তারিত জানুন।

Jun 27, 2026 - 07:44
 0  4
মায়ের পাশেই তিন মেয়ের শেষ ঠিকানা, সবার কাছে দোয়া চাইলেন ছেলে
×

একটি কবরের পাশে আরেকটি কবর—এভাবেই পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শুয়ে রইলেন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার এক মা ও তাঁর তিন মেয়ে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার শাহীনুর বেগম ও তাঁর তিন কন্যাকে শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। দাফনের সময় স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি আর এলাকাবাসীর শোকে ভারী হয়ে ওঠে পুরো জনপদ।

​নিহতরা হলেন—শাহীনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। এর আগে শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো লটিয়া গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

একমাত্র জীবিত ছেলের বিচার ও দোয়ার আকুতি:

​হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া এই পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান ও শাহীনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত জানাজার আগে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি আমার মা-বোনদের এই নৃশংস হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। ঘটনাস্থলে নিহত মূল অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ছাড়াও যদি এই চক্রে অন্য কোনো ঘাতক থেকে থাকে, তবে তাদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। আপনারা সবাই আমার মা ও বোনদের জন্য দোয়া করবেন।”

​নিহত শাহীনুরের মা হাজরা বেগম শোকাহত কণ্ঠে বলেন, “আমার নিরীহ মেয়ে ও নাতনিদের যারা এভাবে জবাই করে হত্যা করেছে, আদালতে তাদের যেন ফাঁসি হয়। আল্লাহ যেন এই দুনিয়াতেই তাদের বিচার করেন।” শাহীনুরের শাশুড়িও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, “আমার ছেলের বউ ও নাতনিদের কী দোষ ছিল? কেন তাদের এভাবে প্রাণ দিতে হলো?”

​হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) টমাস বড়ুয়া জানান, শুক্রবার রাত ১০টায় নামাজে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে মা ও তার তিন মেয়েকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও থানায় দুটি মামলা:

​গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই শাহীনুর বেগম, ইকরা ও শিফার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় সায়মাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। পারিবারিক সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে শাহীনুর বেগমের স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে শাহীনুর রায়পুরে এই ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।

​এই ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা অন্তর মজুমদার নামের এক যুবককে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্তরের মৃত্যু হয়।

এই নৃশংস জোড়া খুনের ঘটনায় রায়পুর থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে:

​হত্যা মামলা: শুক্রবার দুপুরে নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত বাদী হয়ে নিহত অন্তর মজুমদারসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

​পুলিশের ওপর হামলা মামলা: ঘটনার দিন গণপিটুনির শিকার অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে উদ্ধার করতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার ইটপাটকেলের আঘাতে সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। এই ঘটনায় রায়পুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মান্নান বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে আরেকটি মামলা করেন।

​রায়পুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে অন্য কোনো মোটিভ বা চক্র জড়িত ছিল কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইন হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি দিয়ে প্রধান অভিযুক্তকে মেরে ফেলার ঘটনাটিও পুলিশের তদন্তের আওতায় রয়েছে।