কেরানীগঞ্জে কুরিয়ার চালককে নির্যাতনের অভিযোগ

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসে এক চালকের নখ উপড়ে নির্যাতনের অভিযোগে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ওসিসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

Jun 30, 2026 - 21:40
 0  3
কেরানীগঞ্জে কুরিয়ার চালককে নির্যাতনের অভিযোগ
×

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে অবস্থিত ‘স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস’ কার্যালয়ে এক পিকআপ চালককে আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নখ উপড়ে নির্যাতন ও এসিড খাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এই পৈশাচিক নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ শত শত চালক ও শ্রমিক কুরিয়ার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর এবং সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে যাওয়া পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

​সোমবার (২৯ জুন) রাত থেকে শুরু হওয়া এই রণক্ষেত্রে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসিসহ অন্তত ৩ পুলিশ সদস্য এবং চালক-পথচারী মিলিয়ে ১০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ঘটনার নির্মম বিবরণ ও শ্রমিকদের দাবি:

নির্যাতনের শিকার চালক শাহ আলম (২৮) সোমবার সন্ধ্যায় ঘাটারচর এলাকা থেকে প্রতিষ্ঠানের একটি গাড়ি নিয়ে বের হন। পথে সড়কের পাশে গাড়িটি রেখে তিনি নাস্তা করতে যান। ফিরে এসে গাড়িটি আর না পেয়ে তিনি দ্রুত প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ছোটেন এবং কর্মকর্তাদের জিপিএস (GPS) ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করার অনুরোধ করেন। কিন্তু কর্মকর্তারা তাঁর কথা বিশ্বাস না করে উল্টো চুরির অপবাদ দিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখে বেদম মারধর শুরু করেন।

​বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের দাবি, মারধরের একপর্যায়ে কুরিয়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মকর্তা প্লাস দিয়ে টেনে চালক শাহ আলমের পায়ের নখ উপড়ে ফেলেন। রক্তাক্ত শাহ আলম তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি ভিক্ষা চাইলে তাঁকে ব্যাটারির মারাত্মক এসিড পান করানোরও চেষ্টা করা হয়। পরে তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ— কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী রাসেল, মামুন, লিন্টন, কাজল, নুর উদ্দিন ও শুভ সরাসরি এই অমানবিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত।

কুরিয়ারে হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ:

এই বর্বরতার খবর রাতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার বিভিন্ন রুটের শতাধিক চালক ঘাটারচর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিকরা স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভেতরে এবং বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের অর্ধশতাধিক কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের কাচ ভাঙচুর করেন। আজ মঙ্গলবার সকালেও চালকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে অবস্থান সচল রাখেন এবং জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

​শ্রমিক প্রতিনিধি আনোয়ার ও চালক রুবেল বলেন, “প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকিং রয়েছে, চাইলে সহজেই গাড়ির অবস্থান জানা যেত। তা না করে নিরীহ চালকের ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন আমরা মেনে নেব না। দায়ীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি ও আন্দোলন চলবে।” এদিকে, শ্রমিকদের অভিযোগ— পুলিশ এসে দোষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ নিয়ে উল্টো আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট ছুড়েছে।

ওসিসহ পুলিশ আহত, তদন্তের আশ্বাস:

শ্রমিকদের হামলায় আহত কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশকে চারপাশ থেকে ঘেরাও করে এবং লক্ষ্য করে অনবরত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে আমি নিজে, এসআই সোহাগ ও কনস্টেবল জয়নালসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছি। শ্রমিক ও পথচারী মিলিয়ে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।”

​ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আরাফাতুল ইসলাম জানান, “মালিক ও শ্রমিক— উভয়পক্ষের সঙ্গেই আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনা চালাচ্ছেন। দ্রুত সুষ্ঠু সমাধানের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।”